‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তির’ পেছনে আসল সত্যটা কী? প্রকাশিত: ১২:৫১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চুক্তিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চুক্তিটির আইনি কাঠামো, মার্কিন সরকারের অংশীদারত্ব এবং তেল সরবরাহ—সবকিছু নিয়েই জটিলতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, চুক্তিটি যেভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না-ও হতে পারে। ২৫ বছরের বেশি চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ভেনেজুয়েলার তেল খাতের আইন অনুযায়ী, তেল উত্তোলনের কোনো চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছরের বেশি হতে পারে না। অথচ ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে চুক্তিটির মেয়াদ ১০০ বছর পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলার আইন বিশেষজ্ঞ হোসে ইগনাসিও হার্নান্দেজ বলেছেন, আইন এ বিষয়ে স্পষ্ট। তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে চুক্তির কথা ঘোষণা করেছে, সেভাবে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ভেনেজুয়েলা সরকারও জানিয়েছে, চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছর। মার্কিন সরকারের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভেনেজুয়েলার তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স বা ন্যাবেপে মার্কিন সরকারের অংশীদারত্ব। হোয়াইট হাউজ ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন সরকারের মালিকানা ৩৫ শতাংশ। তবে পেন্টাগনের আইনপ্রণেতাদের দেওয়া একটি নথিতে বলা হয়েছে, তাদের হাতে রয়েছে কোম্পানিটির শেয়ার কেনার ‘ওয়ারেন্ট’। অর্থাৎ, সরাসরি শেয়ার মালিকানা আর শেয়ার কেনার অধিকার এক বিষয় নয়। মার্কিন আইনে পেন্টাগনের কৌশলগত মূলধন দপ্তর ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিতে সরাসরি অংশীদারত্ব নিতে পারে কি না, তা নিয়েও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাশলি ডিকস বলেছেন, মার্কিন কংগ্রেস ওই দপ্তরকে এমন বিনিয়োগের ক্ষমতা দিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তেল যাবে কোথায়? ট্রাম্প বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল থেকে সুবিধা পাবে। চুক্তির আওতায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ন্যাবেপের উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ বাজারদরের চেয়ে কম দামে কেনার সুযোগ পাবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু সেই তেল কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যাবে, কী প্রক্রিয়ায় কেনা হবে, এবং তা মার্কিন কৌশলগত তেল মজুত ভরতে কতটা ভূমিকা রাখবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত আবার পূরণ করা হবে। তবে অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, অদূর ভবিষ্যতে এই তেল দিয়ে মজুত পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পেন্টাগনের নতুন ভূমিকা চুক্তির আরেকটি অস্বাভাবিক দিক হলো মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সরাসরি বাণিজ্যিক ভূমিকা। ট্রাম্প প্রশাসন ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ ব্যবহার করে পেন্টাগনের কৌশলগত মূলধন দপ্তরকে বিনিয়োগের মতো কার্যক্রমে যুক্ত করছে। কিন্তু ওই দপ্তরের মূল দায়িত্ব তেল ব্যবসা পরিচালনা নয়। পেন্টাগনের আরেকটি ইউনিট ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস অ্যানালাইসিস অ্যান্ড সাসটেইনমেন্টকে ন্যাবেপের অংশীদারত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সাবেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এই ইউনিটের মূল কাজ হলো মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা। তেল কোম্পানিতে অংশীদারত্ব নেওয়ার সঙ্গে এই দায়িত্বের সরাসরি সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তির কেন্দ্রে আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ত চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভেনেজুয়েলার ব্যবসায়ী আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ত লোপেস। ৪৬ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ীর ভেনেজুয়েলার জ্বালানি ও তেল খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে পড়াশোনা করেছেন। স্পেন, যুক্তরাজ্য ও নিউইয়র্কে তার বাড়ি রয়েছে। তার ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মধ্যে তেল, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতও রয়েছে। একসময় তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি জুলিয়ানিকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। বেতানকুর্ত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন তদন্ত ও আইনি বিরোধের মধ্যে ছিলেন। ২০১৩ সালে তার বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি নিয়ে অভিযোগ ওঠে। তবে ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে আনা র্যাকেটিয়ারিং-সংক্রান্ত অভিযোগ আদালতে টেকেনি। ২০১৮ সালে তার এক ব্যবসায়িক সহযোগী ও চাচাতো ভাই ১২০ কোটি ডলারের অর্থপাচার মামলায় অভিযুক্ত হন। তবে বেতানকুর্ত নিজে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত হননি। তার আইনজীবীও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০২৫ সালে স্পেনে তার একটি প্রাসাদে অর্থপাচার তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ অভিযান চালায় বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তবে ওই তদন্তে বেতানকুর্তের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি দ্য গার্ডিয়ান। বেতানকুর্তের অর্থের উৎস নিয়ে তদন্ত বেতানকুর্তের অর্থের উৎস নিয়ে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন কর্মকর্তাদের মধ্যেও সন্দেহ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তার অর্থের উৎস অনুসন্ধানে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ আইনজীবী, তদন্তকারী ও হ্যাকারদের নিয়োগ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালের একটি নথিতে বেতানকুর্তকে ভেনেজুয়েলার একটি হ্যাকিং কার্যক্রমের ‘সেকেন্ডারি’ লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে তার আইনজীবী এ বিষয়ে সরাসরি নিশ্চিত করেননি। তিনি বলেছেন, বেতানকুর্ত ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরোধী পক্ষকে সমর্থন করতেন। যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের পর বেতানকুর্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তার আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আস্থার যোগাযোগ না থাকায় বেতানকুর্ত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। এরপরেই তার মালিকানাধীন ন্যাবেপকে ঘিরে মার্কিন সরকারের সঙ্গে নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হয়। বড় তেল কোম্পানিগুলো কেন দূরে? আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ফিল গানসনের মতে, বড় তেল কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা চুক্তিটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের উদ্বেগের কারণ হিসেবে চুক্তির স্বচ্ছতার অভাব, শর্ত এবং আইনি অনিয়মের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। এর আগে এক্সনমোবিলের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডসও ভেনেজুয়েলার তেল খাতের বর্তমান আইনি ও বাণিজ্যিক কাঠামোকে বিনিয়োগের জন্য অনুপযোগী বলেছিলেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থকে সরাসরি এই খাতে যুক্ত করে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। ট্রাম্পের তেল দখলের পুরোনো ভাবনা অন্য দেশের তেলসম্পদ দখলের ধারণা ট্রাম্পের জন্য নতুন নয়। ১৯৮৭ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি মার্কিন জাহাজে হামলার প্রসঙ্গে ইরানের তেলক্ষেত্র দখলের কথা বলেছিলেন। পরবর্তী বছরগুলোতেও লিবিয়া ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে সামরিক সংঘাতের পর তেলসম্পদ দখলের ধারণা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। এবার ভেনেজুয়েলায় সেই ধারণাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, যুদ্ধে বিজয়ীরাই যুদ্ধের সম্পদের অধিকার পায়। তবে চুক্তির বাস্তব আইনি কাঠামো, মার্কিন সরকারের ক্ষমতা এবং ভেনেজুয়েলার আইন—সব মিলিয়ে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। Download PhotoCard SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তির’ পেছনে আসল সত্যটা কী?