নেতানিয়াহু ছাড়াও ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রার্থী যারা

প্রকাশিত: ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের আধিপত্য ধরে রাখতে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নির্বাচনী জরিপে তার ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা উঠে এলেও ভোটের আগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও সরকার গঠনের মতো সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের নিশ্চয়তা নেই। 

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করবেন না; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে ভোট দেবেন। ইসরায়েলের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে পার্লামেন্টে আসন বণ্টন করা হবে। ফলে নির্বাচনের ফলাফলের পাশাপাশি সরকার গঠনে জোটের সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক সংঘাত দেশটির রাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানে বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নব্বইয়ের দশকে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০০৯ সাল থেকে প্রায় পুরো সময়ই তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিনি একই সঙ্গে জনপ্রিয় ও বিতর্কিত। 

তার সমর্থকদের কাছে নেতানিয়াহু ‘কিং বিবি’ নামে পরিচিত। তাদের মতে, বৈরী আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার মতো অভিজ্ঞ ও কঠোর নেতৃত্ব প্রয়োজন। তবে গাজায় যুদ্ধসংক্রান্ত অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং ইসরায়েলে দুর্নীতির মামলার বিচার তার রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপে ফেলেছে। নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন জনমত জরিপেও তার দল লিকুদের সমর্থন কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পাশাপাশি ধর্মীয় নীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের অবস্থান নিয়ে ইসরায়েলি সমাজের একটি অংশের অসন্তোষও বেড়েছে। ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু অবশ্য এখনো নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছেন। জয়ী হলে তিনি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের কথা বলেছেন। তবে কোনো দল বা জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।

গাদি আইজেনকোট (৬৬): ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান আইজেনকোট নিজেকে প্রচলিত রাজনীতির বাইরের একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরছেন। গাজায় সামরিক অভিযানে তার ছেলে নিহত হওয়ার ঘটনা তার রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সাধারণ পারিবারিক পটভূমি ও ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের বিষয়টি সামনে রেখে তিনি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসন এবং দুর্নীতির মামলাকে ঘিরে তৈরি বিতর্কের বিপরীতে নিজেকে উপস্থাপন করছেন। তিনি মধ্যপন্থি নতুন দল ‘ইয়াশার’-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। হিব্রু ভাষায় শব্দটির অর্থ সৎ বা নীতিনিষ্ঠ।

নাফতালি বেনেট (৫৪): সাবেক কমান্ডো ও প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা বেনেট একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। পরে তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদের সঙ্গে জোট বেঁধে ২০২১ সালে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। এবারও দুই নেতা ‘টুগেদার’ নামে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে একত্র হয়েছেন। তাদের প্রচারের মূল বক্তব্য, রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে ইসরায়েলকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনা।

অ্যাভিগডোর লিবারম্যান (৬৮): নেতানিয়াহুর সাবেক ঘনিষ্ঠ মিত্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিবারম্যান বর্তমানে তার অন্যতম সমালোচক। ২০১৮ সালে গাজা পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর নন—এমন অভিযোগ তুলে তিনি মন্ত্রিসভা ছাড়েন। রাজনৈতিকভাবে তিনি নেতানিয়াহুর চেয়েও কট্টর ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত। তার দল ‘ইসরায়েল আওয়ার হোম’-এর গুরুত্বপূর্ণ সমর্থকগোষ্ঠী সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ইসরায়েলে আসা অভিবাসীরা।

ইয়ার গোলান (৬৪): সেনাবাহিনীর সাবেক এই জেনারেল ৭ অক্টোবরের হামলার সময় আক্রান্ত এলাকা থেকে মানুষকে উদ্ধারে ভূমিকা রেখে পরিচিতি পান। তিনি ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলটি ঐতিহাসিক লেবার পার্টি ও বামপন্থি মেরেৎজের অবশিষ্টাংশ নিয়ে গঠিত হয়েছে। নির্বাচনে তার লক্ষ্য বাম ও মধ্য-বামপন্থি ভোটকে একত্র করা।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শিবিরে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ (৪৬) ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির (৫০) গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। উভয়েই কট্টর ডানপন্থি রাজনীতির জন্য পরিচিত এবং ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তাদের অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচিত হয়েছে। স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তার বক্তব্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নাকচ করার অবস্থানও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, বেন-গভির ২০০৭ সালে আরববিরোধী উসকানির দায়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন। তিনি ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, কারাগারে তাদের জন্য আরও কঠোর ব্যবস্থা এবং ইসরায়েলি নাগরিকদের অস্ত্র বহরের সুযোগ বাড়ানোর পক্ষে প্রচার চালিয়ে আসছেন। গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া এবং সেখানে পুনরায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন এই দুই নেতা। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান সরকার গঠন-পরবর্তী ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিননীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।

নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলে অতি-গোঁড়া ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাস গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। জোট সরকার গঠনে তাদের সমর্থন প্রায়ই নির্ধারক হয়ে ওঠে। তবে এই সম্প্রদায়ের সদস্যদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে দীর্ঘদিনের অব্যাহতি, শ্রমবাজারে তুলনামূলক কম অংশগ্রহণ এবং সরকারি আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা নিয়ে ইসরায়েলের সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। চলমান যুদ্ধের সময়ে সেনাবাহিনীতে জনবল ও দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে এই বিরোধ আরো প্রকট হয়েছে।

এবারের নির্বাচনে কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়—এমন দলগুলোও সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী রাম ও জয়েন্ট লিস্ট। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। এ ছাড়া নতুন ডানপন্থি দল ‘পিপল অব ইসরায়েল’ এবং মধ্য-ডানপন্থি ‘দ্য রিজার্ভিস্টস’ নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় রয়েছে। জনমত জরিপে এসব দলের সমর্থনের অবস্থান এখনো অনিশ্চিত।

নেতানিয়াহুবিরোধী ভোট একাধিক দলের মধ্যে ভাগ হয়ে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষে সরকার গঠনের মতো আসন নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। আবার ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর সম্মিলিত শক্তিও নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। ফলে ভোটে কোন দল কত আসন পেল, তার পাশাপাশি কোন দল কার সঙ্গে জোট গড়তে প্রস্তুত—সেটিই নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ, যুদ্ধের প্রভাব এবং নিরাপত্তা নিয়ে জনমতের পরিবর্তনের মধ্যে এই নির্বাচন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি দেশটির পরবর্তী নীতিনির্ধারণের দিকও নির্ধারণ করতে পারে।