কঙ্গোতে ইবোলা মোকাবেলায় গিয়ে হামলায় নিহত নার্স, উগান্ডায় নতুন বিধি-নিষেধ

প্রকাশিত: ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলা মোকাবেলায় কাজ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন দুই স্বাস্থ্যকর্মী। তাদের একজন নার্স নিহত হয়েছেন।

অন্যজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বিবিসি জানায়, স্থানীয় কয়েকজন তরুণ তাদের ওপর হামলা চালান। স্বাস্থ্যকর্মীরা পানির উৎস দূষিত করছেন এবং ইবোলা ছড়াচ্ছেন—এমন অভিযোগে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। 

জাতিসংঘের সহায়তায় পরিচালিত রেডিও ওকাপি এ তথ্য জানিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। নিহত নার্সের পরিবার ও সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।
আহত স্বাস্থ্যকর্মীর দ্রুত সুস্থতাও কামনা করেছে সংস্থাটি।

এদিকে ইবোলার বিস্তার ঠেকাতে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যাতায়াতে নতুন বিধিনিষেধ দিয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত বন্ধ রাখা হয়েছে। কঙ্গো থেকে উগান্ডায় ফেরা নাগরিকদের ২১ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এর খরচ তাদের নিজেদের বহন করতে হবে।

 

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলা মোকাবেলায় কাজ করা কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত মাসে ইবোলার বিস্তার ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপের পক্ষে প্রচার চালানোর পর এক রাজনীতিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত আগস্টে রেড ক্রস জানায়, ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর প্রথম ১০০ দিনে তাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা ১১টি সহিংস ঘটনার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক আহত হন। এ ছাড়া একটি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া হয়।

ইবোলা নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, ইবোলা বলে কোনো রোগ নেই। চলতি মাসের শুরুতে কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় ইবোলার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। দেশ দুটির কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত সংক্রমণ সেখানে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয়েছে। সোমবার নাইজেরিয়ায় আক্রান্ত এক নারীকে রাজধানী আবুজা থেকে সুইজারল্যান্ডে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে আরো চিকিৎসা দেওয়া হবে।

 

আফ্রিকা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের প্রধান জ্যঁ কাসেয়া জানান, ওই নারীর জন্ম উগান্ডায়। তিনি সুইজারল্যান্ডের এক কূটনীতিকের স্ত্রী। ছুটি কাটাতে তিনি উগান্ডার রাজধানীতে গিয়েছিলেন। তার শরীরে ইবোলার কোনো উপসর্গ না থাকলেও স্বামীকে তার সঙ্গে সুইজারল্যান্ডে নেওয়া হয়েছে। নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই নারীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি সচেতন আছেন এবং কথা বলতে পারছেন। কর্তৃপক্ষ এখন খতিয়ে দেখছে, ওই নারী কোথায় ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন।

কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর উগান্ডা নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আক্রান্ত ওই নারী এবং কেনিয়ার এক ব্যবসায়ী উগান্ডার মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করেছিলেন। পরে তাদের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়। কেনিয়ার ওই ব্যবসায়ী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে এসেছিলেন। দেশটিতে তার ব্যবসা ছিল। উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কঙ্গো থেকে শুধু জরুরি প্রয়োজনে ভ্রমণকারীদের উগান্ডায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। এ তালিকায় ত্রাণকর্মী, ট্রাকচালক ও নিরাপত্তাকর্মীরা রয়েছেন। তবে তাদের সীমান্ত পার হওয়ার আগে কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।

এ ছাড়া যেকোনো দেশ থেকে উগান্ডায় প্রবেশকারী সব যাত্রীকে তাদের অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য দিয়ে একটি ফরম পূরণ করতে হবে। সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা অন্যদের শনাক্ত করতে এসব তথ্য কাজে লাগানো হবে। কঙ্গো থেকে উগান্ডায় ফেরা নাগরিকদের ২১ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এর খরচও তাদের বহন করতে হবে। উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, কেনিয়ার আক্রান্ত ব্যবসায়ীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬০ জনকে পর্যবেক্ষণ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

কেনিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, দেশটিতে প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ২০ জন ২১ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষে বাড়ি ফিরেছেন। তবে আরো ৯৮ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। দেশটিতে ইবোলা শনাক্ত হওয়া সাতজনের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। কেনিয়ার ওই ব্যবসায়ী নাইরোবিতে পৌঁছানোর দুই দিন পর মারা যান। তার সঙ্গে সম্পর্কিত আরেক নারীও মারা গেছেন। কেনিয়ায় ইবোলায় আক্রান্তের সংখ্যা নয়জনে পৌঁছানোর পর রোগটি নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তিনটি দেশ ঘুরে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কীভাবে শনাক্ত না হয়ে ভ্রমণ করলেন, তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

উগান্ডার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্রিস বারিওমুন্সি বিবিসির ‘নিউজডে’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশকে ইবোলামুক্ত রাখতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর উগান্ডা বারবার জানিয়েছে, দেশটিতে নতুন করে কোনো সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। তবে কঙ্গোতে ইবোলার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর উগান্ডায় ২০ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন মারা যান। পরে গত আগস্টে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উগান্ডাকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করে।

সাম্প্রতিক ঘটনায় আক্রান্ত দুই ব্যক্তি একই দিনে উগান্ডার এনটেবে বিমানবন্দর দিয়ে গিয়েছিলেন। তবে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব ডায়ানা আতওয়াইন জানান, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এর আগে উগান্ডার কর্মকর্তারা বলেছিলেন, নাইজেরিয়ায় আক্রান্ত ওই নারী উগান্ডার মধ্য দিয়ে শুধু যাতায়াত করেছিলেন। তার গন্তব্য ছিল গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চল। তবে রবিবার উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ওই নারীর চলাচল, পুরো ভ্রমণপথ এবং কোথায় তিনি ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন, তা জানতে উগান্ডা ও নাইজেরিয়া একসঙ্গে কাজ করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বারিওমুন্সি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, ইবোলার ঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, কঙ্গোর সঙ্গে উগান্ডার সীমান্ত রয়েছে এবং দেশটিতে এখনো ইবোলার সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যাতায়াত ও পারিবারিক সম্পর্কের কারণে মানুষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরলের সংস্পর্শে এলে ইবোলা ভাইরাস একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়াতে পারে। রক্ত ও বমির মতো তরলের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।

বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ইবোলা ভাইরাসের ধরনটি হলো বান্দিবুগিও। এটি তুলনামূলকভাবে বিরল। এ ধরনের ইবোলার বিরুদ্ধে এখনো কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে এ নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।