রাবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রেলকর্মীদের বিরোধের নেপথ্যে কী?

প্রকাশিত: ৫:৩০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রেলওয়ে কর্মীদের বিরোধ যেন ক্রমেই বাড়ছে। গত জুলাইয়ে ট্রেনের ভেতর এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের পর সেপ্টেম্বরে আরও দুই দফায় শিক্ষার্থীদের হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে টিটিই ও রেলওয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

সর্বশেষ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের কথা-কাটাকাটির পর এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা স্টেশনে গিয়ে ভাঙচুর করেন। এ ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রাবির শিক্ষার্থী পরিচয় পেলেই রেলকর্মীদের আচরণ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। তবে হঠাৎ করে এমন সংঘাতের সূত্রপাত কোথায়, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না এবং বারবার একই ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

‘শুধু রাবির শিক্ষার্থী পরিচয় জানলেই রেলকর্মীরা তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। এক মাসের মধ্যেই চারবার শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে’

জুলাইয়ের ঘটনার পরও থামেনি অভিযোগ

গত ২১ জুলাই ফোরকান উদ্দীন নামে এক শিক্ষার্থীকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ ওঠে কয়েকজন টিটিইর বিরুদ্ধে। ফোরকান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা থেকে পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে রাজশাহী ফেরার সময় যাত্রীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়া টাকা আদায়ের প্রতিবাদ করেন ফোরকান। এ সময় ৬-৭ জন টিটিই তাকে পেছন থেকে গলা ধরে দুই বগির মাঝখানে নিয়ে যান। পরে তার ঘাড় ও পিঠে উপর্যুপরি মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ট্রেনের জানালার পাশে নিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আরও পড়ুন

রাবি শিক্ষার্থীকে মারধর, রাজশাহীর সঙ্গে সারাদেশের রেলযোগাযোগ বন্ধ

এর প্রতিবাদে পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা এলাকায় রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা চার দফা দাবি জানান। পরে রাজশাহী রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর দাবিগুলো মেনে নেওয়া হলে প্রায় আট ঘণ্টা পর অবরোধ তুলে নেন শিক্ষার্থীরা। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত টিটিইকে বরখাস্ত করা হয়।

এর প্রায় দুই মাস পর গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মৃন্ময় চক্রবর্তীকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে একাধিক টিটিইর বিরুদ্ধে। খুলনা থেকে রাজশাহীগামী সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস ট্রেনে চেইন টানাকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে।

‘রেলের নিরাপত্তাকর্মীদের ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। তবে গত জুলাই মাসে আমাদের এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তার পর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে যাত্রাবিরতি ও টিটিইকে বরখাস্তের ঘটনা যেন তারা মেনে নিতে পারছে না। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে যাত্রাবিরতি কার্যকর হবে। এর ক্ষোভেই রেলের কর্মীরা রাবি শিক্ষার্থী দেখলেই চড়াও হচ্ছে’

ঘটনার পর মৃন্ময় চক্রবর্তী বলেন, চেইন টানা তার ভুল হয়েছে এবং এ জন্য তারা ক্ষমাও চেয়েছেন। রেলের আইনে যে শাস্তি রয়েছে, সেটিও মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন তারা। তবে ওই ভুলের কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, অপমান বা হুমকি দেওয়া কাম্য নয়।

স্টেশনে মারধর, এরপর ভাঙচুর

সর্বশেষ রোববার রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে রেলওয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে একই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে মারধর করার অভিযোগ ওঠে নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন

কোটাবিরোধী আন্দোলন / রাবি শিক্ষার্থীদের রেললাইন অবরোধ, যোগ দিয়েছে রুয়েট-রামেক

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এ সময় নিরাপত্তাকর্মীরা ‘চাকরি গেলে যাবে, তবু দুই একটা ছাত্র মরুক’—এমন মন্তব্য করে হামলা চালান। আইয়ুব আলী বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন।

ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘মার্চ টু রাজশাহী স্টেশন’ কর্মসূচি নিয়ে স্টেশনে যান। সেখানে তারা ভাঙচুর চালান। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ ঘটনায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে বারবার কেন রাবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে টিটিই ও নিরাপত্তাকর্মীদের এমন আচরণের অভিযোগ উঠছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

‘রাবির শিক্ষার্থী জানলেই আচরণ বদলে যায়’

রাবির ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী রিদোয়ান হাসান বলেন, ‘আমার বন্ধুর গায়ে রাবির লোগোযুক্ত টি-শার্ট দেখে রেলকর্মীদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তারা তাকে ব্যাপক মারধর করে ফেলে যায় এবং একপর্যায়ে তার গায়ে থুথু নিক্ষেপ করে। রাবির শিক্ষার্থীদের দেখলেই তারা বেপরোয়া আচরণ করছে।’

আরও পড়ুন

রাবি শিক্ষার্থীকে রেলস্টেশনে মারধর-উত্তেজনা, ৪ আরএনবি সদস্য বরখাস্ত

রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ হাসান জানান, শুধু রাবির শিক্ষার্থী পরিচয় জানলেই রেলকর্মীরা তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। এক মাসের মধ্যেই চারবার শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

আসিফ বলেন, ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় দিন দিন এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। কোনো বিচার না পেয়ে গতকাল শিক্ষার্থীরা স্টেশনে ভাঙচুর করেছে।’

রেলস্টেশনে শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আসিফ বলেন, ‘আমার শার্ট ছিঁড়ে যায়, ব্যাগ ছিঁড়ে যায়। এরপর আমি মাটিতে পড়ে যাই। তখন তিনজন আমাকে ধরে টেনে স্টেশনের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একজন সামনে, একজন পেছনে এবং আরেকজন আমার কলার ধরে টানছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ওই কক্ষে যেতে চাইছিলাম না। তখন আমাকে ফেলে দিয়ে বুট পরা অবস্থায় লাথি ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। আমার কাছে থাকা ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় আমাদের সঙ্গে গালাগাল ও দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটে।’

যাত্রাবিরতি নিয়ে ক্ষোভের অভিযোগ

রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘রেলের নিরাপত্তাকর্মীদের ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। তবে গত জুলাই মাসে আমাদের এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তার পর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে যাত্রাবিরতি ও টিটিইকে বরখাস্তের ঘটনা যেন তারা মেনে নিতে পারছে না। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে যাত্রাবিরতি কার্যকর হবে। এর ক্ষোভেই রেলের কর্মীরা রাবি শিক্ষার্থী দেখলেই চড়াও হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কোনো শিক্ষার্থী যদি কোনো অন্যায় করে তাহলে বিদ্যমান আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে গতকাল যেভাবে আমার ভাইকে মারধর করে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছিল, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপও নেয়নি, যার কারণে ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। আশা করি, সামনের দিনে কোনো রাবি শিক্ষার্থীর সঙ্গে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে না।’

আরও পড়ুন

শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় স্টেশন ভাঙচুর, তদন্ত কমিটি করলো রেলওয়ে

তবে রেলকর্মীদের এমন আচরণের পেছনে যাত্রাবিরতি নিয়ে ক্ষোভের অভিযোগটি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা যায়নি।

‘পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান জানান, ‘ঘটনাগুলো বেশ উদ্বেগজনক। বারবার এগুলো ঘটে যাচ্ছে। গতকালের ঘটনার পরও আমি রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলি। এর আগেও তাদের সতর্ক করার চেষ্টা করেছি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। আমি উপযাচক হয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। মনে হয়েছে, এটা তাদের বিষয় নয়, এটা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের।’

প্রক্টর আরও বলেন, ‘একটা জায়গায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তৈরি হলে তার দায় সবার। সে জায়গা থেকে সবাই মিলে সমাধান করার চেষ্টা করা উচিত। কিছু জায়গাতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। কর্তৃপক্ষের এ সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করা উচিত।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ নয়, কিছুদিন ধরেই দেখছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। অতীতের কোনো ঘটনায় সুস্পষ্ট ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় তারা বারবার এমন সাহস পাচ্ছে। এ ধরনের আচরণ থেকে তাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেন এমন আচরণ করা হচ্ছে, তা জানতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তা আব্দুল আলীম মিঠু জাগো নিউজকে বলেন, সব টিটিই কিন্তু এক না। গতকালকের ঘটনায় যারা জড়িত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হোক সেটা আমিও চাই-কিন্তু শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ক্ষতি করা কি আদৌও ঠিক হয়েছে? হ্যাঁ, এটাও ঠিক রাবি শিক্ষার্থীদের আঘাত করা হয়েছে সেটা মোটেও কাম্য না। সেই জন্য অভিযুক্ত টিটিইদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল।

এমএমআরজে/কেএইচকে/এএসএম