ইমানের পঞ্চদশ শাখা: নবীজির (সা.) প্রতি সম্মান

প্রকাশিত: ৬:০০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২৬

ভালোবাসা আর সম্মান এক বিষয় নয়। মানুষ কাউকে ভালোবাসতে পারে, কিন্তু সেই ভালোবাসা সবসময় সম্মানের পর্যায়ে পৌঁছে না। যেমন, একজন বাবা তার সন্তানকে খুব ভালোবাসেন। সন্তানের সুখ-দুঃখে তিনি পাশে থাকেন, তার জন্য কষ্ট করেন এবং তাকে নিজের মতো করে আগলে রাখেন। তার এই ভালোবাসায় ‘স্নেহ’ বা ‘মায়া’ থাকে। কিন্তু ‘সম্মান’ থাকে না। অন্যদিকে সন্তান যখন বাবার সঙ্গে কথা বলে, তার আদেশ মানে এবং তার সামনে নিজের আচরণ সংযত রাখে, তখন সেখানে শুধু ভালোবাসা সঙ্গে সম্মানও থাকে।

নবীজির (সা.) প্রতি আমাদের যে ভালোবাসা, সেখানে সম্মান থাকা জরুরি। তাকে ভালোবাসা যেমন ইমানের দাবি, তেমনই তার মর্যাদা উপলব্ধি করে তাকে সম্মান করাও ইমানের অংশ। কারণ তিনি শুধু আমাদের প্রিয় মানুষ নন; তিনি আল্লাহর রাসুল, যিনি আমাদের কাছে আল্লাহর পবিত্র বাণী পৌঁছে দিয়েছেন এবং হেদায়াতের পথ দেখিয়েছেন।

সম্মানের প্রধান শর্ত হলো আনুগত্য করা

নবীজির (সা.) প্রতি সম্মান প্রকাশের প্রধান শর্ত হলো তার আনুগত্য করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোনো (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ ও তার রাসুলকে অমান্য করল, সে স্পষ্টভাবে পথভ্ৰষ্ট হলো। (সুরা আহযাব : ৩৬)

অর্থাৎ নবীজির (সা.) আদেশ-নিষেধের ওপর কারও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ নেই। তার নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। আর এটাই তার সম্মানের দাবি। কারণ কাউকে সম্মান করার অর্থ শুধু তাকে মর্যাদার আসনে রাখা নয়; বরং তার কথা ও নির্দেশকে গুরুত্ব দেওয়া। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা নবীজির (সা.) আনুগত্যকে আবশ্যক করেছেন এবং তার অবাধ্যতার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। ফলে নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার আনুগত্য জীবনের বাস্তব আচরণে প্রকাশ পায়।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের সামনে আগ বাড়িয়ে কোনো কিছু কোরো না এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা হুজুরাত: ১)

এই আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে, একবার কোরবানির দিন কিছু সাহাবি নবীজির (সা.) কোরবানি করার আগেই নিজেদের পশু জবাই করে ফেলেছিলেন। আবার কারও মতে, যুদ্ধ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আগ বাড়িয়ে কিছু করার প্রসঙ্গেও আয়াতটি নাজিল হয়েছিল। বর্ণনাগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকলেও আয়াতের শিক্ষা স্পষ্ট—দ্বীন ও দুনিয়ার যে বিষয়ে নবীজির (সা.) স্পষ্ট নির্দেশ আছে, সেখানে নিজের মত বা সিদ্ধান্তকে তার আগে রাখা যাবে না। বিশেষ করে ইবাদত, হালাল-হারাম ও দীনের বিধানের ক্ষেত্রে তার নির্দেশের ওপর অন্য কোনো বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না।

তবে দুনিয়ার স্বাভাবিক ও কারিগরি বিষয় এর বাইরে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে আমার চেয়ে ভালো জানো।’ (সহিহ মুসলিম: ২৩৬৩) তাই কৃষি, কারিগরি বা পার্থিব অভিজ্ঞতার মতো বিষয়ে মানুষের নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। দ্বীনের বিধান আর দুনিয়ার অভিজ্ঞতাকে এক করে দেখা যাবে না।

নবীজিকে (সা.) অন্যদের মতো সম্বোধন করা যাবে না

নবীজির (সা.) নাম বলতে গিয়ে কেবল ‘মুহাম্মদ’ বলা যাবে না, বরং দরুদ পড়তে হবে, এবং নামটিও আদবের সাথে উচ্চারণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরকে যেভাবে ডাকো রাসুলকে সেভাবে ডেকো না’ (সুরা নুর : ৬৩)

এর মানে, মানুষ সাধারণত একে অপরকে যেভাবে নাম ধরে ডাকে, নবীজিকে (সা.) সেভাবে ডাকা যাবে না। তার মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে সম্মানজনকভাবে সম্বোধন করতে হবে। বাংলায় সম্মানের জন্য ‘হজরত’ শব্দ ব্যবহারের প্রচলন আছে। আমরা এই শব্দটি তার নামের আগে ব্যবহার করতে পারি।