ঢিলেঢালা অভিযানে নদীর বুকজুড়ে ইলিশ শিকারের মহোৎসব

প্রকাশিত: ১২:২৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

ভোলার মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকায় গত ৮ অক্টোবর থেকে চলছে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এসময় ভোলার মেঘনা ও তেতুলিয়া নদী থাকার কথা ছিল জেলেশূন্য। কিন্তু এর উল্টো চিত্র নদীগুলোতে। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দল বেঁধে জেলেরা দিন ও রাতে মা ইলিশ শিকার করছেন। সেসব ইলিশ আবার বিভিন্ন স্থায়ী ও অস্থায়ী ঘাটে এনে প্রকাশ্যে হাঁকডাক দিয়ে বিক্রিও হচ্ছে।

এমন ঘটনায় ক্ষুব্ধ জেলার সচেতন জেলেরা। তাদের দাবি, এভাবে মা ইলিশ নিধন হলে আগামীতে ইলিশের তীব্র সংকট দেখা দেবে। ইলিশের উৎপাদন কমে যাবে।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য মতে, ২০২১-২২ অর্থ বছরে ভোলায় ইলিশ উৎপাদন হয় ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০৫ মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে অর্থ বছরে হয় ১ লাখ ৭ হাজার ৯৯৪ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৭৪ মেট্রিক টন, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে হয় ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন ও ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে উৎপাদন হয় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩৩১ মেট্রিক টন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম হওয়ায় ইলিশ অহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ড ও অর্থ দণ্ডের বিধান রয়েছে।

অথচ সরকারি আইনকে তোয়াক্কা না করেই চলছে মা ইলিশ শিকারের মহোৎসব। ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর, ধনিয়া, কাচিয়া, পূর্ব ইলিশা, পশ্চিম ইলিশা, রাজাপুর ভেদুরিয়া, ভেলুমিয়া ইউনিয়নের মেঘনা ও তেতুলিয়া তীরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রকাশ্যে জেলেরা দল বেঁধে নৌকা ও ট্রলার নিয়ে নদীতে জাল ফেলছেন। আর তাদের জালে উঠে আসছে বিভিন্ন সাইজের ডিমওয়ালা মা ইলিশ। ওই ইলিশ তীরে এনে স্থায়ী ও অস্থীয় ঘাটে প্রকাশ্যে হাঁক-ডাক দিয়ে বিক্রি করছেন আড়তদাররা। সেখানে ভিড়ও রয়েছে চোখে পড়ার মতো।

এত কর্মযজ্ঞের মধ্যে মৎস্য বিভাগের তেমন কোনো অভিযান চোখে পড়েনি। তবে কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের টিম আসার পর মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে যায় ওইসব এলাকা।

ভোলার শিবপুর ইউনিয়নের জেলে নূরউদ্দিন মাঝি জানান, তিনি জেলে পেশা ছাড়া অন্য কিছু জানেন না। অভিযানের মধ্যে কয়েকদিন বসেছিলেন। পরে গত ৫-৬ দিন ধরে তার ট্রলার নিয়ে ৪-৫ জন ভাগী জেলেসহ নদীতে যাওয়া শুরু করেছেন। প্রতিদিন বিকেল ও রাতে তিনি ইলিশ শিকার করতে যান। এসময় নদীতে ইলিশ বেশি আসে। তাই প্রতিদিন প্রায় ৮-১০ হাজার টাকার ইলিশ পাচ্ছেন। তার জালে ধরা পড়া প্রায় সব ইলিশের পেটেই ডিম রয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নদীতে মাছ ধরা ঠিক না জানি, কিন্তু কী করব? মাছ ধরতে না গেলে সংসার চালাব কীভাবে?’

ধনিয়া এলাকার জেলে সাহাবুদ্দিন মাঝি বলেন, ‘অভিযানের প্রথম কয়দিন নদীতে যাইনি, এখন যাচ্ছি। মৎস্য অফিস থেকেতো দিনে একবার আবার কোনোদিন অভিযানই চালায় না। কিন্তু কোস্টগার্ড প্রতিদিন আমাদের এলাকায় অভিযান চালায়। ওরা এলে অনেক জেলেকে ধরে নিয়ে যায়। কোস্টগার্ড চলে গেলে আমরা নদীতে গিয়ে ইলিশ শিকার করি। পরে ওই ইলিশ তুলাতুলি ঘাটের পাশে অস্থায়ী ঘাটে বিক্রি করি। কিন্তু অভিযানের আগে যেমন দাম ছিল এখন ওই দাম নাই, কিছুটা কম। তারপরও দ্রুত বিক্রি করে ফেলি।’

রাজাপুর ইউনিয়নের জেলে ইয়ামিন মাঝি ও ইব্রাহীম মাঝি বলেন, ‘নদীতে মাছ না ধরলে খাব কী? সংসার কীভাবে চালাব? সরকারতো ২৫ কেজি চাল দিছে। আর তো কিছু দেই নাই। শুধু ভাত খেলেতো হবে না। ভাতের সঙ্গে তরকারি ও মাছ লাগে। এছাড়াও আমাদের সন্তানদের প্রাইভেট বেতন, স্কুল, সংসারের খরচ জোগাতে হয়। কিস্তির টাকাও তো দিতে হবে। এজন্য বাধ্য হয়ে ইলিশ ধরি।’

এদিকে শিবপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সচেতন জেলে নুর ইসলাম মাঝি বলেন, আমরা সরকারি অভিযান মেনে নদীতে যাই না। আজ মাছে ডিম ছাড়লে কাল ইলিশ বাড়বে। পরে আমরাইতো এই ইলিশ ধরতে পারব। এজন্য সরকারি আইন মেনে নদীতে যাই না। অথচ তাদের এলাকার শত শত অসাধু জেলে দল বেঁধে ডিমওয়ালা মা ইলিশগুলো শিকার করে ফেলছে। কিন্তু মৎস্য বিভেগের কোনো ভূমিকা নেই। তারা যদি নিয়মিত নদীতে অভিযান চালাতো তাহলে অসাধু জেলেরা এভাবে মা ইলিশ ধ্বংস করতে পারত না।

পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের মৎস্য আড়তদার ও মৎস্যজীবী সমিতির নেতা মো. সাহাবুদ্দিন ফরাজি জানান, দেশের ইলিশ সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। আমরা যারা সচেতন আড়তদার আছি, সবাই ২২ দিনের জন্য আড়ত বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ আমরা আড়ত খোলা রাখলে জেলেরা নদীতে গিয়ে মাছ ধরবে। কিন্তু ভোলার কিছু অসাধু আড়তদার আড়ত খোলা রাখছে। ফলে জেলেরা নদীতে গিয়ে মা ইলিশ শিকার করছে। এতে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশের তীব্র সংকট দেখা দেবে। আমরা প্রশাসনের কাছে জোর অনুরোধ করছি, তারা দ্রুত কঠোর হয়ে মা ইলিশ রক্ষা করুন।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। এ পর্যন্ত সাত উপজেলা থেকে ১৯৭ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। এরমধ্যে ৭০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও ৬১ জনকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু আমাদের জনবল ও প্রয়োজনীয় কিছু সংকটের কারণে নিয়মিত কঠোরভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারছি না। জনবল সংকটের কারণে লোক কম থাকলে অভিযানের সময় জেলেরাও হামলার চেষ্টা করে।

তিনি আরও বলেন, আমরা শতভাগ অভিযান বাস্তবায়ন করতে না পারলেও যেভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে তাতে অনেক মা ইলিশ ডিম ছাড়তে পারছে। এতে নদীতে ইলিশের সংকট থাকার কথা না। কারণ একটি ইলিশ ডিম ছাড়লে লাখ লাখ বাচ্চা হয়।