এশিয়া থেকে ইউরোপ: বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের দাবানল প্রকাশিত: ১২:৩২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬ রুমিয়া হক শর্মী শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ এখন আর কেবল শ্রেণিকক্ষ কিংবা ক্যাম্পাসের দাবি-দাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে পড়ছে রাষ্ট্রের জবাবদিহি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বৈষম্যবিরোধী বৃহত্তর সংগ্রামে। শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, নেপাল, ভারতের পর এখন ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। নানান দাবি-দাওয়া, অধিকার আদায়ে বই-খাতা ফেলে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছে, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা যখন জনমনে শিকড় গাড়ে, তখন তরুণদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা সহজ নয়। কখনো শিক্ষার অধিকার, কখনো দুর্নীতির প্রতিবাদ, কখনো গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। ভৌগোলিক দূরত্ব ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও এসব আন্দোলনের অন্তর্নিহিত প্রশ্ন প্রায় অভিন্ন রাষ্ট্র কার স্বার্থে পরিচালিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন কোথায় ঘটবে? ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমেই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। সার্বিয়ায় দুর্নীতি, স্বচ্ছতা ও সরকারি জবাবদিহির দাবিতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদ রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ইতালি, রোমানিয়া ও তুরস্কেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয়, গণতান্ত্রিক অধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মতো বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও কর্মীসংকট, শিক্ষার পরিবেশ এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন তরুণদের ক্ষোভকে আরও বিস্তৃত করেছে। ইউরোপীয় শিক্ষার্থী ইউনিয়নের ২০২৬ সালের পর্যবেক্ষণেও বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের এই বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। এশিয়ার চিত্রও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন, নেপালের তরুণদের রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং ইন্দোনেশিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ দেখিয়েছে, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ কখনো কখনো বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিতে পারে। এসব আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এক নয়, কোথাও রাজনৈতিক জবাবদিহি, কোথাও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, কোথাও অর্থনৈতিক চাপ কিংবা সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ মুখ্য হয়ে উঠেছে। তবু একটি বিষয়ে তাদের মিল রয়েছে প্রচলিত ব্যবস্থার কাছে প্রত্যাশিত পরিবর্তন না পেলে তরুণেরা বিকল্প উপায়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে চায়। প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এত বিস্তৃত হচ্ছে কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে কেবল তাৎক্ষণিক ঘটনাকে দেখলে চলবে না, তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার দিকে তাকাতে হবে। শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, আবাসনসংকট, সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে হতাশার একটি জমাট বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যখন দেখে, যোগ্যতা ও পরিশ্রমের পরও সুযোগের বণ্টনে বৈষম্য রয়ে গেছে, তখন তাদের ক্ষোভ শুধু ব্যক্তিগত অসন্তোষে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়। এই আন্দোলনের বিস্তারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মুহূর্তের মধ্যে একটি ঘটনার খবর, প্রতিবাদের ছবি কিংবা দাবিসংবলিত বার্তা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশের তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করছে। তবে তথ্যের দ্রুত বিস্তার যেমন জনমত গঠনে সহায়তা করে, তেমনি যাচাইহীন তথ্য ও গুজব আন্দোলনের উদ্দেশ্যকে বিভ্রান্তও করতে পারে। তাই ডিজিটাল সংযোগের পাশাপাশি তথ্য যাচাই, যুক্তিনির্ভর অবস্থান এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব অপরিহার্য। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মানেই সব ক্ষেত্রে একই দাবি, একই পদ্ধতি কিংবা একই পরিণতি নয়। কোনো আন্দোলন নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারে, কোনোটি দীর্ঘ আলোচনার সূচনা করে, আবার কোনোটি প্রত্যাশিত ফল অর্জনে ব্যর্থও হতে পারে। প্রতিবাদের ন্যায্যতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার পদ্ধতি, নেতৃত্ব ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনাও তাৎপর্যপূর্ণ। দাবি আদায়ের পর প্রতিষ্ঠান গঠন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অর্জিত অধিকার রক্ষা করতে না পারলে আন্দোলনের সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের জন্যও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। দেশের ইতিহাসে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। ভাষার অধিকার থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা জাতীয় জীবনের গতিপথে প্রভাব রেখেছে। কিন্তু আন্দোলনের শক্তিকে স্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তনে রূপ দিতে হলে শিক্ষার মান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও আবেগের পাশাপাশি যুক্তি, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। ইউরোপ থেকে এশিয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের এই বিস্তার মূলত একটি সতর্কবার্তা। নতুন প্রজন্ম কেবল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, তারা বর্তমানেই ন্যায়সংগত সুযোগ, মর্যাদা ও অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা চায়। তাদের প্রশ্নের উত্তর দমন কিংবা উপেক্ষার মাধ্যমে নয়, সংলাপ, সংস্কার ও জবাবদিহির মধ্য দিয়েই দিতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরকে অবজ্ঞা করা মানে ভবিষ্যতের সংকেতকে অগ্রাহ্য করা। আর সেই সংকেত সময়মতো বুঝতে ব্যর্থ হলে ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গই একদিন দাবানলে পরিণত হতে পারে। লেখক: শিক্ষার্থী ও সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইডেন মহিলা কলেজ। Download PhotoCard SHARES সারা বাংলা বিষয়: এশিয়া থেকে ইউরোপ: বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের দাবানল