চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক-তৃতীয়াংশ বাড়িতেই ডেঙ্গুর লার্ভা

প্রকাশিত: ৫:০৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন আশঙ্কাজনক রূপ নিচ্ছে। জেলা হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছেন। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী আসায় দেখা দিয়েছে তীব্র বেড সংকট, যার ফলে অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। আকস্মিক এই রোগী বৃদ্ধির কারণে জেলার সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর যেমন প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে গভীর উদ্বেগ।

সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার ১৫৪টি বসতবাড়িতে একটি বিশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপ চালায় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। জরিপের ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ। পরীক্ষা করা ১৫০ টি বাড়ির মধ্যে ৫২টি বাড়িতেই ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, পৌর এলাকার প্রায় ৩৬ শতাংশ বা প্রতি ৩টি বাড়ির ১টিতেই এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়ে আছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী। একই সময়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৫ জন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে তিনজনকে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৭৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৪৮ জন, নারী ১৬ জন এবং শিশু নয়জন।

শহরের মসজিদ পাড়া মহল্লার শহিদুল ইসলাম বলেন, আমার পুরো পরিবার এখন ডেঙ্গুর কবলে, এক চরম অসহায় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। ঘরের চারজন সদস্যের মধ্যে আমি ছাড়া বাকি তিনজনই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। কারো শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছে, মনে হচ্ছে হাড়গোড় ভেঙে যাচ্ছে; আবার কারো শরীরে তীব্র লালচে র‍্যাশ (চামড়ায় দাগ) উঠেছে।

সোনার মোড় এলাকার বাসিন্দা আতাউর রহমান বলেন, ছোট বাচ্চার তীব্র জ্বর আর শরীর ব্যথা দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না। আমাদের এলাকার পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। শুধু আমার ঘরেই নয়, প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরেই এখন ডেঙ্গু রোগী। অথচ এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা বা মশা মারার ওষুধ ছিটানোর ব্যাপারে প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।

গত ৭ দিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন আসমাউল ইসলাম সাগর তিনি বলেন, দিনে দিনে হাসপাতালে মানুষ বাড়ছে, বেড খালি নেই। আমরা সাধারণ মানুষ এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। যদি এখনই এই মশার বংশ ধ্বংস করা না হয়, তবে আমাদের এই পাড়ার পরিস্থিতি আরও কতটা ভয়ানক হবে। কয়েকদিন ধরেই হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে আছি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীর জন্য হাসপাতালে বেড রয়েছে ২৫-৩০ টি কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী। এতে বেড না পেয়ে হাসপাতালে মেঝেতে ট্রলি উঠার সিঁড়িতে বসে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। এতে ভোগান্তি বাড়ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুব হাসান বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জামের কোনো সংকট নেই। বেড সংকটের কারণে ভোগান্তি হচ্ছে। তবে আমরা সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ. কে. এম. শাহাব উদ্দীন বলেন, শহরের ১৫০টি বাড়িতে জরিপ চালানো হয়। এরমধ্যে ৫৪টি বাড়িতেই এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শহরের বাড়িতে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব হচ্ছে ৩৬ ব্রুটো ইনডেক্স এটি উদ্বেগজনক ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি মাথায় রেখেই আমার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসারে, এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ২০ ব্রুটো ইনডেক্সের বেশি হলেই ওই এলাকায় ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চঝুঁকি থাকে এবং মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে এই ঘনত্ব ৩৬ ব্রুটো ইনডেক্স। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের মসজিদপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, নিউ ইসলামপুর, উদয় সংঘের মোড়, চরজোতপ্রতাপসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর সংক্রমণ সব চেয়ে বেশি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে যে সব এলাকায় ডেঙ্গু সংক্রমণ বেশি সে সব এলাকায় এরই মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। এটি আরও বেগবান করতে পৌর এলাকায় ৮ টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমের সদস্যরা মশক নিধন অভিযান তদারকি করবেন। আমরা আশা করছি শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী শুধু জেলা শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়েছে এমনটা নয়। গ্রামগুলোতেও দিনে দিনে ভয়াবহ হচ্ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গোমস্তাপুর, শিবগঞ্জ, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলাতেও ডেঙ্গু রোগী মিলছে।

সোহান মাহমুদ/এসজেডএইচ