কৃষকের ৩০ টাকার সবজি শহরে ৬০, বাড়তি টাকা কার পকেটে প্রকাশিত: ৪:৪৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০২৬ তেলের প্রভাব কেজিতে ১ টাকারও কম হাট পেরোলেই দ্বিগুণ হচ্ছে দাম খরচের চেয়ে দামের ফারাক বেশি বগুড়ার মাঠে কৃষক যে পটল বিক্রি করছেন ৩০ টাকায়, মহাস্থান হাটে সেটিই উঠছে ৪০ টাকায়। শহরের ফতেহ আলী বাজারে গিয়ে সেই পটলের দাম দাঁড়াচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। শসার ক্ষেত্রেও একই চিত্র—কৃষকের ৩০-৩৫ টাকার পণ্য শহরে বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়। অথচ গত সাত দিনে মহাস্থান হাটে পটল, করলা, ফুলকপি, মুলাসহ বিভিন্ন সবজির দাম কমেছে। কৃষক থেকে শহরের ক্রেতার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পরিবহন, শ্রমিক, খাজনা, বাছাই, পচন ও ব্যবসায়ীর লাভ—বিভিন্ন খরচ যুক্ত হওয়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। তবে পরিবহন ব্যয়ের হিসাব বলছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ভাড়া বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে তার প্রভাব কেজিতে এক টাকারও কম। ফলে হাটে দাম কমার পরও শহরের বাজারে একই হারে না কমার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মহাস্থান হাট ও ফতেহ আলী বাজার ঘুরে কৃষক, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। হাটে কমেছে দাম, শহরে একই চিত্র মহাস্থান হাটে গত সাত দিনে পটলের দাম ৪০ টাকা থেকে কমে ২৫-৩০ টাকা হয়েছে। করলা ৫৫ থেকে কমে ৪৫, ফুলকপি ৭০-৮০ থেকে ৬০ এবং মুলা ৩৫ থেকে ২২ টাকা হয়েছে। লেবু ৩০ টাকা থেকে কমে ২০ টাকা হালি হয়েছে। অন্যদিকে ফতেহ আলী বাজারে সোমবার পটল ৫০-৬০, করলা ৮০ এবং ফুলকপি ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। হাটে কৃষকের কাছ থেকে পটল কেনার সময়ও দামের বড় পার্থক্য দেখা যায়। কৃষক ৩০ টাকা পেলেও মহাস্থানে পাইকারি দর হচ্ছে ৪০ টাকা। এরপর শহরের বাজারে তা আরও ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যাচ্ছে। শসার ক্ষেত্রেও কৃষক ৩০-৩৫ টাকা পেলেও মহাস্থানে দর ৪০ টাকা এবং ফতেহ আলীতে ৫০-৬০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাট থেকে শহরে আনার পথে পরিবহন, শ্রমিক, খাজনা, পলিথিন, বাছাই ও পচনের খরচ রয়েছে। এসব খরচের সঙ্গে ব্যবসায়ীর লাভ যোগ হয়। পরিবহন খরচে কতটা বাড়ছে দাম? ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর পরিবহন ভাড়া বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চালক ও ব্যবসায়ীরা। তবে বাড়তি ভাড়াকে কেজিপ্রতি হিসাব করলে অঙ্কটি খুব বেশি নয়। চালক মোবারক হোসেন জানান, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জে পিকআপের ভাড়া আগে ছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা। এখন ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা। এক ট্রিপে প্রায় ১৫ লিটার তেল লাগে। ট্রাকচালক শফিকুর রহমান বলেন, বগুড়া-টাঙ্গাইল রুটে ভাড়া আগে ছিল ৮ হাজার টাকা। এখন ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা। তাঁর ট্রাকে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার কেজি পণ্য যায়। ফলে ১ হাজার টাকা ভাড়া বাড়লেও প্রতি কেজিতে বাড়তি খরচ পড়ে প্রায় ২০ পয়সা। চট্টগ্রাম রুটের চালক শরিফুল ইসলামের হিসাবে, বগুড়া-চট্টগ্রাম যাওয়া-আসায় ভাড়া আগে ছিল ২৪-২৫ হাজার টাকা। এখন ২৮-৩০ হাজার। তাঁর ট্রাকে প্রায় ১৪ হাজার কেজি সবজি যায়। ফলে ৪-৫ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়ার প্রভাব কেজিতে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩৫ পয়সা। মহাস্থান থেকে শহরে সবজি আনতেও ভাড়া বেড়েছে। ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম জানান, আগে ভ্যানভাড়া ছিল ১৫০ টাকা, এখন ২৫০ টাকা। একটি ভ্যানে ১৬০ থেকে ২০০ কেজি সবজি ওঠে। ফলে বাড়তি ১০০ টাকা ভাড়ার প্রভাব কেজিতে প্রায় ৫০ থেকে ৬৩ পয়সা। অবশ্য পাইকারি ব্যবসায়ী শাহিনুর ইসলামের দাবি, দুরের বাজারে ট্রাকের ভাড়া শুধু তেলের কারণে নয়, গাড়ির সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বেড়েছে। তার ভাষ্য, চট্টগ্রামে মিনি ট্রাকের ভাড়া আগে ১৮ হাজার টাকা থাকলেও এখন ২৫ হাজার টাকা দিয়েও গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকার ভাড়াও প্রায় ৯ হাজার থেকে বেড়ে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। ‘ধলতা’য় কমে কৃষকের প্রকৃত দাম শুধু পরিবহন নয়, হাটে বিক্রির সময়ও কৃষকের প্রাপ্ত দাম কমে যায় বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। মহাস্থান হাটে কেজিপ্রতি এক টাকা খাজনা দিতে হয় বলে জানিয়েছেন তারা। এর সঙ্গে রয়েছে ধলতা বা বাড়তি ওজন। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ৪০ কেজির এক মণের জায়গায় অনেক সময় ৪২ থেকে ৪৩ কেজি সবজি দিতে হয়। দূরের বাজারে নেওয়ার পথে পচন ও ওজন কমার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এই বাড়তি সবজি নেওয়া হয় বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ৪০ কেজি পটল ৩০ টাকা দরে বিক্রি করলে দাম হয় ১ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু একই টাকা পেতে ৪২ কেজি দিতে হলে কার্যকর দর দাঁড়ায় কেজিতে ২৮ টাকা ৫৭ পয়সা। ৪৩ কেজি দিলে তা নেমে আসে ২৭ টাকা ৯১ পয়সায়। এর সঙ্গে খাজনাও দিতে হয়। কৃষক শাহিদ আলী বলেন, মাঠের শ্রমিক, গাড়িভাড়া, হাটের খাজনা ও গন্তব্যে শ্রমিকের খরচ বাদ দিলে কৃষকের হাতে খুব বেশি লাভ থাকে না। ব্যবসায়ীদের হিসাবেও প্রশ্ন সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, পটল কৃষকের কাছ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে কেনার পর শহরে ৫০-৬০ টাকা হলেও মহাস্থান থেকে শহরে আনার বাড়তি ভাড়া কেজিতে এক টাকার মতো। দূরের রুটে বাড়তি ট্রাকভাড়াও অনেক ক্ষেত্রে কেজিতে এক টাকা ছাড়াচ্ছে না। তাই ২০-৩০ টাকা দামের ব্যবধানের পুরোটা শুধু তেলের দাম বা পরিবহন ব্যয় দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। শ্রমিক, খাজনা, পচন, ওজন ঘাটতি, বাছাই ও ব্যবসায়ীর লাভ প্রতিটি খাতে কত টাকা যাচ্ছে, তার হিসাব স্পষ্ট হওয়া দরকার। ব্যবসায়ী জাফর বলেন, দূরের বাজারে সবজি পাঠাতে বড় ট্রাকের ভাড়া আগে ২২-২৫ হাজার টাকা থাকলেও এখন ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। পথে সবজি নষ্ট হলে সেই লোকসানও ব্যবসায়ীকে বহন করতে হয়। পরিবহন ছাড়াও শ্রমিক, বাছাই, পলিথিন ও খাজনার খরচ রয়েছে। চাপ বাড়ছে ভোক্তার ওপর ফতেহ আলী বাজারের ক্রেতাদের অভিযোগ, হাটে সবজির দাম কমলেও শহরে তার সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মোস্তফা কামাল বলেন, বেতন বাড়েনি, অথচ বাজারে প্রতিদিনের খরচ বাড়ছে। একই টাকা দিয়ে আগের চেয়ে কম পণ্য নিতে হচ্ছে। মনজুরুল হক নামের একজন শিক্ষক বলেন, কৃষক কম দামে বিক্রি করছেন, আবার শহরে আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। মাঝখানে কোথায় কত টাকা বাড়ছে, তার হিসাব থাকা দরকার। মাদুর বিক্রেতা সন্তোষ চন্দ্র দেব বলেন, আয় কম, খরচ বেশি। বাজার করতে গিয়ে এখন সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে। কোন পণ্যের দাম কেন বাড়ছে, সেটা বুঝি না। কিন্তু বাড়তি টাকাটা আমাদেরই দিতে হচ্ছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বগুড়ার সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব পণ্যের দামে পড়তে পারে। তবে তেলের দাম বা পরিবহন ব্যয় বাড়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারেন না। তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলে তা মানতে হবে। নির্ধারিত মূল্য না থাকলেও অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো বা অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট তথ্য পেলে অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। Download PhotoCard SHARES সারা বাংলা বিষয়: কৃষকের ৩০ টাকার সবজি শহরে ৬০বাড়তি টাকা কার পকেটে