লাঠিতে ভর দিয়ে ভ্যানের প্যাডেলে জীবন চলছে বৃদ্ধ হযরত আলীর

প্রকাশিত: ২:০৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০২৬

এক পা পুরোপুরি অচল। শরীরের ভার নিতে লাঠি কিংবা টেচার ছাড়া চলতে পারেন না। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। তবুও প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হন ৭০ বছরের হযরত আলী। সঙ্গে থাকে একটি পুরোনো ভ্যান। জীবিকার জন্য ভ্যানটি এখন তার একমাত্র অবলম্বন।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার রামচন্দ্রপুর দিঘীর পাড়ে ছোট্ট একটি ঘরে বসবাস হযরত আলীর। ঘরে রয়েছে সাত বছরের দুই সন্তান। তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব তার কাঁধে। তাই শরীরের অক্ষমতা কিংবা বয়স কোনোটিই তাকে ঘরে বসে থাকার সুযোগ দেয় না।

সকালে ভ্যান নিয়ে বের হওয়ার সময় হাঁটার লাঠিটিও ভ্যানের সঙ্গে বেঁধে রাখেন হযরত আলী। দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পর সেই লাঠিতে ভর করেই ভ্যান থেকে নামেন। অনেক সময় স্ত্রীকে টেচার এগিয়ে দিতে হয়। সেটিতে ভর করে ধীরে ধীরে ঘরে ঢোকেন তিনি।

দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, একজন বৃদ্ধ মানুষ হয়ত কোথাও যাচ্ছেন। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে তিনি বয়ে নিয়ে চলছেন একটি পরিবারের বেঁচে থাকার দায়িত্ব।

হযরত আলীর জীবনে এই দুর্দশা অবশ্য নতুন নয়। কয়েক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার প্রথম স্ত্রী। এরপর ক্যানসারে আক্রান্ত মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিজের সঞ্চয় ও শেষ সম্বলটুকুও ব্যয় করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়েকেও বাঁচাতে পারেননি হযরত আলী।

এরপর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দ্বিতীয় সংসারে নতুন করে ঘর বাঁধেন তিনি। এই সংসারে সাত বছরের দুই সন্তান। আগের ঘরে একটি ছেলে রয়েছে, সেও শারীরিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক নন। ফলে সংসারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে হযরত আলীর ওপরই পরিবারের বড় দায়িত্ব।

শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েও অন্যের কাছে হাত পাততে চান না হযরত আলী। নিজের শ্রমে যতটুকু সম্ভব উপার্জন করেই সংসার চালান। কিন্তু সেই আত্মসম্মানের পথটিও তার জন্য সহজ নয়।

কারণ দুই মাস আগে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ছিল একটি মিশুক। প্রতিদিনের মতো মিশুক নিয়ে বের হয়েছিলেন হযরত আলী। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে দুই ব্যক্তি মিশুক ভাড়া করে তাকে মধুপুর পৌর শহরের দিকে নিয়ে যায়। পথে মিশুকে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে যন্ত্রাংশ কিনতে যান তিনি। এসময় অসহায় হযরতকে সহানুভূতি দেখিয়ে দুই যাত্রীর একজন তার হাত ধরে রাস্তা পার করে দেন। কিন্তু সেই সহানুভূতির আড়ালেই ছিল প্রতারণার পরিকল্পনা।

যন্ত্রাংশ কিনে ফিরে এসে হযরত আলী দেখেন, সেখানে নেই তার মিশুক। নেই সেই দুই যাত্রীও। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে হারিয়ে যায় তার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।

মিশুক হারিয়ে বোয়ালী সেতুর পাশে লাঠি হাতে বসে অনেকক্ষণ কাঁদেন হযরত আলী। সেই কান্না শুধু একটি যান হারানোর কান্না ছিল না। তার সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিল তার পরিবারের প্রতিদিনের খাবারের নিশ্চয়তা।

তখন স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তাকে বাড়ি ফেরার ভাড়া দেন। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মিশুক উদ্ধারের চেষ্টার কথাও জানান তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিশুকটি পাওয়া যায়নি, এর জন্য থানায় জিডিও করেছিলেন তিনি, কিন্তু কোনো প্রতিকার মেলেনি। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই মাস।

এ দুই মাসে হযরত আলীর জীবন আরও কঠিন হয়েছে। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসারে নেমে এসেছে অভাব। শেষ পর্যন্ত সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে কিছুদিন আগে একটি পুরোনো ভ্যান কিনেছেন তিনি। এখন সেই ভ্যান নিয়েই নতুন করে শুরু করেছেন জীবিকার লড়াই।

ভ্যান কেনার ঋণের কিস্তি আর সংসারের খরচ মিলিয়ে হিসাব মেলাতে পারছেন না তিনি। সারাদিন পরিশ্রম করে যা আয় হয়, তাতে সমিতির কিস্তির টাকা জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর রয়েছে দুই শিশুর খাবার, পোশাক, চিকিৎসা এবং ঘরের অন্যান্য খরচ। খেয়ে না খেয়েই চলছে তাদের সংসার।

হযরত আলীর সবচেয়ে বড় কষ্ট, শরীর তাকে সহযোগিতা করে না। হাঁটার সময় এক পা টেনে নিতে হয়। লাঠিতে ভর না দিলে কয়েক কদম এগোনো কঠিন। তারপরও ভ্যান চালাতে হয়। কারণ হযরত আলী ঘরে বসে থাকলে চুলায় আগুন জ্বলবে না।

স্থানীয় বাসিন্দা রহমত মিয়া বলেন, হযরত আলীর জীবনযুদ্ধ তারা প্রতিদিন দেখছেন। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সক্ষমতা নেই। তারপরও সন্তানদের কথা ভেবে কাজ করে যাচ্ছেন।

মুদি দোকানি জামাল মিয়া বলেন, হযরত আলীর মতো একজন অসহায় বৃদ্ধের পাশে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে তার একটি বয়স্ক ভাতার কার্ডও নেই। ফলে বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার বাইরে রয়েছেন তিনি।

হযরত আলীর পরিবারের জন্য সবচেয়ে জরুরি এখন নিয়মিত আয়ের একটি ব্যবস্থা। পাশাপাশি প্রয়োজন তার চিকিৎসা এবং দুই শিশুর জন্য সহায়তা। একটু নিরাপদ জীবিকার সুযোগ পেলে হয়ত জীবনের শেষ সময়ে তাকে আর প্রতিদিন ভ্যান চালাতে হবে না।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন সকালে লাঠি ভ্যানে বেঁধে ঘর থেকে বের হন হযরত আলী। সারাদিন ভ্যান চালিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসেন। ভ্যান থেকে নামার সময় আবার হাতে তুলে নেন সেই লাঠি। তারপর স্ত্রীর সহায়তায় টেচারে ভর করে ঢোকেন ছোট্ট ঘরে।

দুই শিশুর মুখের দিকে তাকিয়েই হয়ত প্রতিদিন সকালে ভ্যান নিয়ে বের হওয়ার শক্তি পান হযরত আলী। শরীর তাকে থামিয়ে দিতে চায়। বয়স তাকে বিশ্রামের কথা বলে। দারিদ্র্য তাকে বারবার হার মানাতে চায়। কিন্তু দুই শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে হযরত আলী এখনও রাস্তায় নামেন। লাঠিতে ভর দিয়ে ভ্যানের প্যাডেলে পা রাখেন। জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়েও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন হযরত আলী।