পূজার ছুটিতে সাহসী অভিযান সাইংপ্রার ঝর্ণাধারায় অলস দুপুর বিকেল বেলায়

প্রকাশিত: ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২৬
পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসছে স্বচ্ছ জলের ধারা। চারপাশে ঘন সবুজ বন; খাড়া পাহাড় আর বিশাল পাথরের সারি।

কোথাও ঝিরির কলতান, কোথাও পাহাড়ের নিস্তব্ধতা। দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে প্রকৃতির এমন পরিবেশ  বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সাইংপ্রা ঝর্ণায়। 

ঝর্ণাটি পর্যটকের কাছে তুলনামূলক কম পরিচিত। তবে জায়গাটি উপভোগ করতে হলে কেবল প্রকৃতিপ্রেমী হলেই চলে না; শারীরিক সক্ষমতা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আর দুর্গম পাহাড়ি পথে চলার মন থাকা চাই।

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার পূর্ব দিগন্তে চিম্বুক রেঞ্জের কির্সতং পাহাড়। তার কাছাকাছি অবস্থান সাইংপ্রা ঝর্ণার অবস্থান। প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের মতো এখানে সহজে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পাহাড়ি ট্রেইল, খাড়া ঢাল আর বড় বড় পাথর পেরোতে হয় ঝর্ণাটির কাছে যেতে।

চার-পাঁচটি ধাপে নেমে আসা ঝর্ণাটির প্রতিটি স্তরেই আলাদা সৌন্দর্য। পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়া পানির শব্দ আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি এখানে তৈরি করে অন্যরকম আবহ।
‎
‎দুর্গম পথেই অভিযানের রোমাঞ্চ 

সাইংপ্রা ঝর্ণায় যাওয়া সুবিধাজনক রুট কির্সতং ও রংরাং পাহাড় অভিযান শেষে খেমচং পাড়া হয়ে যাওয়া। মেনিয়াংক পাড়া থেকে রংরাং ও কির্সতং পাহাড় সামিটের পরিকল্পনার সঙ্গে ঝর্ণাটিকে যুক্ত করলে বাড়তি একটি দিন হাতে রাখা যেতে পারে। তবে পুরো পথের দুর্গমতা বিবেচনায় ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে।

খেমচং পাড়া থেকে সাইংপ্রা ঝর্ণার ট্রেকিং শুরু হয়। প্রথমেই খাড়া পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হয়। এরপর সামনে পড়ে বড় বড় বোল্ডারে ভরা পিচ্ছিল পাথুরে পথ। কোথাও পাথর আঁকড়ে এগোতে হয়, কোথাও পা ফেলার জায়গা খুঁজতে হয় সতর্ক হয়ে। বৃষ্টির পর পথটি আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
‎
‎পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামার পর একপর্যায়ে শুরু হয় ওপরে ওঠার পালা। পাথুরে পথ ধরে দীর্ঘ সময় ধরে এগিয়ে যাওয়ার পর দেখা মেলে সাইংপ্রা ঝর্ণার। দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য পথ পেরিয়ে চোখের সামনে ঝর্ণাধারা ভেসে ওঠার মুহূর্তটি অভিযাত্রীদের কাছে হয়ে ওঠে বিশেষ প্রাপ্তি।

এই যাত্রায় শুধু ঝর্ণা দেখাই নয়, কুয়াশায় ডাকা পাহাড়ের প্রকৃতি আর দুর্গম পরিবেশকে কাছে পাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। ঘন বন, পাথুরে পথ আর নির্জন পাহাড়ি জনপদ মিলিয়ে পুরো ট্রেকিং হয়ে ওঠে রোমাঞ্চকর।

‎
‎যেভাবে যাওয়া যাবে

ঢাকা থেকে সাইংপ্রা ঝর্ণায় যেতে প্রথমে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় পৌঁছাতে হবে। সরাসরি আলীকদমগামী বাস পাওয়া গেলে যাত্রা সহজ। সরাসরি বাস না পেলে কক্সবাজারগামী বাসে চড়ে চকরিয়া নেমে সেখান থেকে আলীকদম যাওয়া যায়।
‎
‎আলীকদম পৌঁছে পানবাজার এলাকা থেকে স্থানীয় গাইডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এরপর মোটরসাইকেল অথবা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত চান্দের গাড়িতে করে ১৩ কিলো এলাকায় যেতে হয়। সেখান থেকে দুসরী বাজার হয়ে মেনকিউ পাড়া ও মেনিয়াংক পাড়ার দিকে এগোতে হয়।
‎
‎ভ্রমণপথের নানা অংশে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত জায়গার নাম ও যাতায়াতের ব্যবস্থা সম্পর্কে আগেই নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সড়ক ও পরিবহন পরিস্থিতি অনুযায়ী যাত্রার সময় এবং ব্যয়ও পরিবর্তিত হতে পারে।
‎
‎মেনিয়াংক পাড়া থেকে রংরাং ও কির্সতং পাহাড় অভিযানের পর খেমচং পাড়া হয়ে সাইংপ্রা ঝর্ণার পথে যাওয়া যায়। দুর্গম ট্রেইল এবং যাতায়াতের সময় বিবেচনায় খুব সকালে যাত্রা শুরু করা প্রয়োজন। একই দিনে ঝর্ণা দেখে নিরাপদে ফিরে আসা সম্ভব কি না—তা আবহাওয়া, দলের সক্ষমতা ও স্থানীয় গাইডের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
‎
‎আদিবাসী পাড়ায় রাতযাপনের সুযোগ

সাইংপ্রা ঝর্ণার আশপাশে পর্যটকদের জন্য প্রচলিত হোটেল বা রিসোর্টের ব্যবস্থা সীমিত। ফলে ভ্রমণকারীদের রাতযাপনের জন্য স্থানীয় আদিবাসীদের সহযোগিতা নিতে হয়। মেনিয়াংক পাড়াসহ সংশ্লিষ্ট পাড়ায় থাকার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই পাড়ার কারবারির সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো। স্থানীয়দের বাড়িতে অতিথি হিসেবে থাকার ব্যবস্থা হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে পাড়ার মানুষের সম্মতি, স্থানীয় রীতিনীতি ও সামাজিক শিষ্টাচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি।

খাবারের ব্যবস্থাও আগে থেকে আলোচনা করে নেওয়া উচিত। এসব দুর্গম এলাকায় খাবারের দোকান ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সহজে পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং জরুরি সরঞ্জাম সঙ্গে রাখতে হবে।
‎
অভিযানের প্রস্তুতিতে যা প্রয়োজন

সাইংপ্রা ঝর্ণা ভ্রমণ মোটেও সহজ নয়। দীর্ঘ সময় হাঁটা, খাড়া পাহাড়ে ওঠানামা এবং পিচ্ছিল পাথুরে পথ পার হতে হয়। এ জন্য শারীরিক প্রস্তুতিও দরকার। সঙ্গে নিতে হবে ভালো মানের ভ্রমণ ব্যাগ, বৃষ্টির পানি থেকে জিনিসপত্র রক্ষার জন্য রেইনকভার, উপযোগী জুতা, পানির বোতল, শুকনো খাবার, স্যালাইন, গ্লুকোজ, প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী এবং হেডল্যাম্প।
‎
‎পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যেতে পারে। তাই পর্যাপ্ত খাবার পানি সঙ্গে রাখা জরুরি। পাশাপাশি মশা ও অন্যান্য পোকামাকড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এলাকাটি ম্যালেরিয়াপ্রবণ হলে ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
‎
‎কির্সতং ও রংরাং অভিযানের পথ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকলে স্থানীয় গাইডের সহায়তা নেওয়া জরুরি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পথ হারানো, পাথরে পিছলে পড়ে যাওয়া কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই দলের সদস্যদের সক্ষমতা অনুযায়ী পরিকল্পনা এবং প্রয়োজন হলে অভিযান সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়।
‎
‎পর্যটনের সম্ভাবনা, সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশের কারণে সাইংপ্রা ঝর্ণা ভবিষ্যতে অভিযানপ্রেমী পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। কির্সতং ও রংরাং পাহাড় অভিযানের সঙ্গে ঝর্ণাটি যুক্ত হলে একই ভ্রমণে পাহাড়ের চূড়া, পাথুরে ট্রেইল ও জলধারার সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ মেলে।
‎
‎তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য পাহাড়ে ফেলে রাখলে নষ্ট হতে পারে ঝর্ণার প্রাকৃতিক পরিবেশ। তাই পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপদ ভ্রমণব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
‎
‎সাইংপ্রা ঝর্ণার প্রকৃত আকর্ষণ শুধু এর জলধারায় নয়; সেখানে পৌঁছানোর দুর্গম পথে, পাহাড়ের নীরবতায় এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা জীবনের একটি অর্জনও। যারা পাহাড়কে কাছ থেকে অনুভব করতে চান, তাদের কাছে এই ঝর্ণা হতে পারে ব্যতিক্রমী গন্তব্য। তবে সেই সৌন্দর্য উপভোগের আগে প্রয়োজন যথাযথ প্রস্তুতি, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ।