পর্যটক বরণে সাজছে সেন্টমার্টিন, দৈনিক যেতে পারবেন কতজন? প্রকাশিত: ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬ দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। আগামী ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য খুলছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন ভ্রমণের দুয়ার। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। পর্যটন চালুর খবরে দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে আয়-রোজগার বাড়ার আশায় নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। পর্যটকদের বরণ করে নিতে হোটেল-রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলোতে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মেরামত ও সাজসজ্জার কাজ। রবিবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন ভ্রমণের অনুমতির কথা জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে আন্তমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পর্যটক বরণে প্রস্তুতি সবুজ ঘাসে ঘেরা রিসোর্ট, সামনে নীল সমুদ্র। সেন্টমার্টিন জেটি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে দক্ষিণপাড়ায় সৈকতমুখী অরণ্য ইকো রিসোর্ট। দীর্ঘ বিরতি শেষে পর্যটকদের বরণ করে নিতে সেখানে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। শ্রমিকদের কেউ আঙিনা পরিষ্কার করছেন, কেউ গোছাচ্ছেন কক্ষ। শুধু এই রিসোর্ট নয়, পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতেও চলছে মেরামত ও সাজসজ্জা। পর্যটকদের আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। রাত্রিযাপনের সুযোগ থাকছে না দীর্ঘদিন পর্যটকদের ভ্রমণ সীমিত থাকা এবং রাত্রিযাপনের সুযোগ বন্ধ থাকায় সেন্টমার্টিনের পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আসন্ন মৌসুমে পর্যটকদের আগমন বাড়লে সেই সংকট কিছুটা কাটবে। দ্বীপের ইকো রিসোর্টের পরিচালক ও পর্যটন ব্যবসায়ী খায়রুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর্যটন বন্ধ থাকায় রিসোর্টের কাঠের কাঠামো ও ছাউনি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় রিসোর্টের অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। সেগুলো এখন মেরামত করছি, যাতে পর্যটন মৌসুম শুরু হলে পর্যটকদের বরণ করে নিতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বছরে মাত্র দুই-তিন মাসের পর্যটন মৌসুমের আয় দিয়েই আমাদের সারা বছর চলতে হয়। কিন্তু গত দুই বছর ধরে রাত্রিযাপন বন্ধসহ পর্যটক সীমিত রাখায় আমরা পর্যটন ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছি। এরই মধ্যে বুকিংয়ের সাড়া পাচ্ছি।’ দ্বীপে বাড়ছে শ্রমিক নেওয়ার আবেদন পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মেরামত ও সাজসজ্জার কাজ করতে শ্রমিক নেওয়ার আবেদন বাড়ছে। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসে পর্যটন ব্যবসায়ীরা তিন শতাধিক আবেদন করেছেন। যাচাই-বাছাই করে এসব আবেদনের বিষয়ে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। দ্বীপে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। দ্বীপের গলাচিপায় হোটেল সেইলার ইকো-রিসোর্টের সাজসজ্জার জন্য শ্রমিক নেওয়ার অনুমতি চেয়েছেন ঢাকার মিরপুরের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় হোটেলের বাঁশের ছাউনি ও বেড়া পরিবর্তনসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হবে। পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে রিসোর্ট প্রস্তুত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পর্যটকদের বুকিংও পাওয়া যাচ্ছে।’ হোটেল-রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলোতে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মেরামত ও সাজসজ্জার কাজ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, পর্যটন ব্যবসায়ী ও দ্বীপবাসীর স্বার্থ বিবেচনায় সরকার রাত্রিযাপনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে পাঁচ মাস পর্যটনের সুযোগ দেবে। জেটির পন্টুন নিয়ে উদ্বেগ পর্যটন চালুর খবরে দ্বীপজুড়ে প্রস্তুতি চললেও জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুনের জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, পন্টুন মেরামত করা না হলে পর্যটকদের ওঠানামার সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্বীপের বাসিন্দা মুহাম্মদ আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর পর্যটকবাহী জাহাজ আসতে যাচ্ছে। জেটির কাজ শেষ হলেও জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুন জরাজীর্ণ। মরিচা ধরে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এমন অবস্থায় পর্যটন মৌসুমে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই এটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাছাড়া জেটি নির্মাণের কাজেও অনিয়ম হয়েছে।’ সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক-ব্যবসায়ী সমিতির দায়িত্বে থাকা আব্দুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর্যটন মৌসুম ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। পর্যটকদের আগমন শুরু হলে দ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরতে পারে।’ সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘দ্বীপের দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁয় মেরামত ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। আগামী মাস থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তার আগে জেটির পন্টুন মেরামত করা জরুরি। অন্যথায় পর্যটকদের ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে।’দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে আয়-রোজগার বাড়ার আশা কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, ‘প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন জেটির কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এখনও কিছু কাজ বাকি আছে। তবে জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই প্ল্যাটফর্মের কাজ শেষ করা হবে, যাতে পর্যটকদের ভোগান্তি না হয়। জেটি নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।’ পরিবেশ রক্ষা ও জীবিকার সমন্বয় পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে পরিবেশ রক্ষায়ও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। টেকনাফের ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে হোটেল-রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নেওয়ার জন্য আবেদন করছেন। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় পরিচ্ছন্নতা দলসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটন বন্ধের সময়ে দ্বীপের মানুষের জীবিকা নির্বাহের বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রস্তাব সংশ্লিষ্টদের কাছে দেওয়া হয়েছে।’ চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক কামরুল হাসান বলেন, ‘পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিন দ্বীপের পরিবেশ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের পলিথিনসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্য বহন না করতে নিরুৎসাহিত করা হবে।’ গত বছর জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিন ভ্রমণে অনুমোদিত নৌযান, অনলাইন টিকিট, ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ওই নিয়মে নভেম্বরে দিনে গিয়ে দিনে ফেরার ব্যবস্থা, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ এবং দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক ভ্রমণের সীমা ছিল। ফেব্রুয়ারিতে পর্যটন বন্ধ রাখার বিধানও ছিল। তবে এবার পর্যটন মৌসুমের সময়সীমা ও পর্যটকসংখ্যায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পাশাপাশি জেটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্বীপের পরিবেশ রক্ষাই এখন সংশ্লিষ্টদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। Download PhotoCard SHARES সারা বাংলা বিষয়: দৈনিক যেতে পারবেন কতজন?পর্যটক বরণে সাজছে সেন্টমার্টিন