শুরু না হতেই শেষ হয়ে গেল কলাবতী শাড়ির গল্প

প্রকাশিত: ৩:৪৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২৬

কলাগাছের সুতা থেকে তাঁতশিল্পী রাধাবতী দেবীর কলাবতী শাড়ি তৈরির গল্পটা সারাদেশের জানা। তবে গল্প থেমে আছে সেখানেই। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি উদ্যোগের অভাবে শিল্পটি আর এগোয়নি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কলাগাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরি করা সম্ভব বলে জানান রাধাবতী দেবী।

জানা যায়, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে দেশে শাড়ির বাজারে নতুন যোগ হয় কলাগাছের সুতার শাড়ি। কলা গাছের আঁশ থেকে সুতা আর সুতা থেকে শাড়ি। সেই সময় বান্দরবান জেলা প্রশাসকের আমন্ত্রণে শাড়িটি বোনেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের উপজেলার শিল্পী রাধাবতী দেবী। শাড়িটি তৈরি করতে অনেক কষ্ট হওয়ায় শিল্পীর নামের সঙ্গে মিল রেখে শাড়িটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কলাবতী’। সেই সময় মূলত বান্দরবান জেলার আর্থ সামাজিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে কলা গাছ থেকে সুতা তৈরি করে বিভিন্ন হস্তজাত শিল্পের পাশাপাশি শাড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সুতা তৈরি করার পর শাড়ি তৈরির জন্য মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থেকে তাঁতশিল্পী রাধাবতী দেবীকে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি প্রথমে সেই সুতা দিয়ে শাড়ি বানানো যাবে না বললেও পরবর্তীতে একটি ছোট কাপড় তৈরি করেন। সেইসময় সংশ্লিষ্ট সকলের অনুরোধে প্রায় ১৫ দিনের চেষ্টায় রাধাবতী দেবী শাড়ি তৈরি করতে সক্ষম হন। তবে এরপর থেকেই অনেকটা হারিয়ে গেছে শিল্পটি। সরকার বা ব্যক্তি উদ্যোগে কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির কোনো প্রশিক্ষণ বা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফলে শিল্পটি অনেকটাই আলোর মুখ দেখার আগেই হারিয়ে গেছে।

বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয় ও বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড থেকে জানা যায়, কলা গাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি বাজারে আনার জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল। এজন্য দুই মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে তা বাজারে আনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। একটি শাড়ি তৈরি করতে অনেক টাকা খরচ হয়। শাড়ি তৈরির পর আরামদায়ক ও মসৃণ হয় না। এসব বিষয় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

কলাবতী শাড়ির শিল্পী রাধাবতী দেবী বলেন, কলা গাছের সুতা দিয়ে আমি এখন পর্যন্ত ৯টি শাড়ি তৈরি করেছি। প্রথম শাড়ি ২০২৩ সালে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের আমন্ত্রণে গিয়ে বানিয়েছিলাম। এরপর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ওই বছর সেপ্টেম্বরে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া গ্রামের ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর নারীদের নিয়ে ২০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে ৩০ জন নারীকে কলাগাছ থেকে সংগ্রহ করা সুতা দিয়ে শাড়ি বুননের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে আমরা ৪টি শাড়ি তৈরি করি। এই প্রশিক্ষণে আমাকে ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল।

একই বছর ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা ৬০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। তখন ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ওখানে আমরা ৪টি শাড়ি তৈরি করেছিলাম। প্রশিক্ষণে সকল খরচ বাদে আমাকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এরপর থেকে এই বিষয়ে আমাকে আর কেউ কোনো খোঁজ করেনি।

রাধাবতী দেবী বলেন, একটা শাড়ি তৈরি করতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। শাড়ি তৈরি করতে কলা গাছের ৫০০ গ্রাম সুতার প্রয়োজন হয়। এছাড়াও আরও ৫০০ গ্রাম সুতার প্রয়োজন হয়। আমরা চাইলে বান্দরবন থেকে কলাগাছের সুতা নিয়ে আসতে পারব। তবে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। শাড়ি বানাতে পারিশ্রমিক খরচ অনেক বেশি, এজন্য অর্থের প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে আমরা শাড়ি তৈরি করতে পারছি না। যে দুই জায়গায় প্রশিক্ষণ দিয়েছি তারা খরচ বহন করেছে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে যদি উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে অনেক ভালো হবে। আমার কাছে টাকা নেই, তা না হলে আমি নিজেই উদ্যোগ নিতাম। কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির পরিপূর্ণ একটা শিল্প তৈরি করতে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার প্রয়োজন। এত টাকা আমার কাছে নেই। এজন্য ইচ্ছা থাকলেও কাজ করতে পারছি না। এই শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, যে কলাগাছ থেকে সুতা বের হয় এসব কলা গাছ আমাদের সিলেট অঞ্চলে নেই। বান্দরবানের পাহাড় থেকে কলাগাছ সংগ্রহ করে সুতা বের করতে হবে । আমি এখন বিছানার চাদর তৈরি করি। এসব চাদর দেশে ও দেশের বাইরে বিক্রি হয়।

এ বিষয়ে বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. শামীম আলম বলেন, কলা গাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরি পুরোপুরি বন্ধ আছে। আমরা ২ মাসের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। তবে এই প্রকল্পটি সাফল্য পায়নি। এজন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কারণ প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ থেকে সবকিছুতে অনেক বেশি ব্যয় হয়েছে। এছাড়াও এটির কীভাবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যাবে এ বিষয়ে কোনো সঠিক তথ্য উপস্থাপন হয়নি প্রশিক্ষণে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (এসিসিআর ও মার্কেটিং) রতন চন্দ্র সাহার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, কলা গাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি এখনো বাজারে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আমরা যতটুকু জানি আমাদের একটা প্রতিনিধি দল বান্দরবান গিয়েছিল সেসময়। বাজারে শাড়িটি আনতে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন। একটি শাড়িতে কতটুকু কলা গাছের সুতা ব্যবহার হবে এছাড়া অন্য সুতা কতটুকু ব্যবহার হবে, তা সুস্পষ্ট হয়নি। এছাড়াও মসৃণ ও আরামদায়ক হতে হবে। এসব নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, শুধু বান্দরবান নয়, এসব শাড়ি অনেকেই বানানোর চেষ্টা করছেন। তাঁত বোর্ডের কাছে যদি এ বিষয়ে কেউ সহযোগিতা চায় তাহলে আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব।