আদিবাসী পল্লীতে অর্থাভাবে বন্ধ স্কুল, শিশুদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত প্রকাশিত: ৫:২৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬ পাবনার ঈশ্বরদী আদিবাসী পল্লীতে একসময় একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। যেখানে পাঠদানের পাশাপাশি নিজস্ব ভাষার চর্চা হতো। সেটি একদশক আগে বন্ধ হয়ে গেছে। পুরানো সেই স্কুলের ভবন, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল ও খেলার মাঠ সবই আগের মতোই রয়েছে। নেই শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী। স্কুলের দরজায় ঝুলছে তালা। যে স্কুল চত্বর একসময় শিশুর কলকাকলিতে মুখরিত থাকতো, সেখানে এখন শুধুই নীরবতা। এ এলাকার আদিবাসী শিশুরা এখন শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকার পাশাপাশি আর্থিক অভাব, অনটন, সামাজিক বৈষম্য, অসচেতনতা ও কুসংস্কারের বেড়াজালে বন্দি। জানা যায়, এ উপজেলায় পাঁচ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এদের মধ্যে দাশুড়িয়া ইউনিয়নের মারমী গ্রামে মাল পাহাড়িয়া সম্প্রদায় বেশি বসবাস করেন। এ পল্লীর শিশুদের জন্য নিজস্ব কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। তাদের নিজস্ব মালপাহাড়ি ভাষা শিক্ষা ও চর্চার ব্যবস্থা নেই। এক থেকে দেড় কিলোমিটার পায়ে হেঁটে শিশুদের পার্শ্ববর্তী গ্রামের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। অনেক শিশু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে চায় না। ফলে শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ছে শিশুরা। আদিবাসী পল্লী মারমীতে ১৯৩২ সালে শিশু শিক্ষাকেন্দ্রটি বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহায়তায় স্থানীয়রা নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে এখানে পাকা অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০১৬ সালে আর্থিক সংকটে তা বন্ধ হয়ে যায়। আদিবাসী পল্লির বাসিন্দারা জানান, স্কুলটিতে অর্ধ শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। এখানে পাঠদানের পাশাপাশি আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা মালপাহাড়ির চর্চা হতো। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয়দের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত হলেও অর্থাভাবে ২০১৬ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন আদিবাসী পল্লির শিশুদের অনেকেই আর স্কুলে যায় না, তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে মাঠে কাজ করে। কিছু ছেলে-মেয়ে হেঁটে এক-দেড় কিলোমিটার দূরের স্কুলে গেলেও তাদের কষ্টের শেষ নেই। মারমী গ্রামের আদিবাসী অমিত বিশ্বাস বলেন, একসময় আমি ও আমার বোন এ স্কুলে পড়াশুনা করেছি। আর্থিক সংকটে এটি এখন বন্ধ রয়েছে। আমাদের এলাকার শিশুরা এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে পাশের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে। শিশুরা অনেকেই দূরের স্কুলে যেতে চাই না। তারা মা-বাবার সঙ্গে কৃষি কাজে যাচ্ছে। ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ থেকে অনার্স পাশ করেছেন মারমী আদিবাসি পল্লির সঞ্জিত দাস। তিনি বলেন, আমিসহ এ পল্লীর শিশুরা সবাই একসময় নিজ এলাকার স্কুলে পড়তাম। পরবর্তীতে আর্থিক সংকটের কারণে এটি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন পাশের গ্রামের স্কুলে এ এলাকার কিছু শিশুরা পড়াশুনা করে। মারমী আদিবাসী পল্লীর যুবক সমর বিশ্বাস এখন ঈশ্বরদী প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরে মাঠ সমন্বয়কের চাকরি করছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আদিবাসী পল্লীর এ শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশুনার হাতেখড়ি হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন স্কুল কলেজে পড়াশুনা করে বিএসএস পাশ করেছি। তিনি আরও বলেন, শিশু শিক্ষাকেন্দ্রটি আদিবাসী পল্লীতে ছিল বলেই আমরা পড়াশুনার সুযোগ পেয়েছিলাম। এখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে আরও শিক্ষার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু এ শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা শঙ্কিত। কারণ এখনো আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষা নেওয়ার হার অত্যন্ত কম। নিজ পল্লীতে স্কুল থাকায় বেশিরভাগ শিশুই স্কুলে আসতো। কিন্তু এখন দূরের স্কুলে সবাই যেতে চায় না। অভিভাবকরাও শিশুদের দূরের স্কুলে না পাঠিয়ে সঙ্গে করে কাজে নিয়ে যাচ্ছে। আগামীতে এভাবে চলতে থাকলে শিশুরা লেখাপড়া থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হবে। আদিবাসী শিশু শিক্ষাকেন্দ্রটির শিক্ষিকা আগনেশ মাধবী বিশ্বাস বলেন, অর্থের অভাবে আমাদের একমাত্র শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেছে। এ প্রতিষ্ঠানটি চালু করতে সরকারি বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এগিয়ে আসেনি। এখানকার শিশুদের এক-দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। এতে অনেক শিশু শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম মাঝি জাগো নিউজকে জানান, মারমী আদিবাসী পল্লীর শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ পল্লীর শিশুদের পড়াশুনা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আদিবাসী শিশুরা এক থেকে দেড় কিলোমিটার পায়ে হেঁটে পার্শ্ববর্তী গ্রামের স্কুলে যাচ্ছে। অনেক শিশুই দূরের স্কুলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ফলে তারা শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ছে। তিনি আরও জানান, স্কুলটি বন্ধের পর তৎকালীন সময়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও শিক্ষা অফিসারের নিকট একাধিকবার ধরনা দিয়েও স্কুলটি চালুর ব্যাপারে কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি। উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোসা. শাহিনা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, আদিবাসী পল্লীর এ শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই। কেউ কিছু কখনও জানায়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কেন বন্ধ রয়েছে বিস্তারিত খবর জানার চেষ্টা করবো। Download PhotoCard SHARES সারা বাংলা বিষয়: আদিবাসী পল্লীতে অর্থাভাবে বন্ধ স্কুলশিশুদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত