একসময় রিকশাই ছিল প্রেমের বাহক

প্রকাশিত: ৫:১৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬

একটি রিকশা, দুজন মানুষ আর শহরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রেমের গল্পের জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু লাগত না। ছিল না হাতে হাতে মুঠোফোন, ছিল না মুহূর্তেই বার্তা পাঠানোর সুযোগ। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা করাটাই ছিল বড় ঘটনা। আর দেখা হয়ে গেলে পাশাপাশি বসে রিকশায় চেপে শহরের অলিগলি পেরিয়ে যাওয়ার সেই সময়টুকু হয়ে উঠত দিনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্মৃতি।

আজকের দ্রুতগতির শহরে সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। এখন দূরত্ব কমেছে, যোগাযোগ সহজ হয়েছে, কিন্তু সেই অপেক্ষার মায়া যেন কমেছে। তাই পুরোনো দিনের রিকশার কথা উঠলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে শুধু যাতায়াতের স্মৃতি নয়-ভেসে ওঠে প্রেম, বন্ধুত্ব, বৃষ্টি, বিকেল আর দুজন মানুষের একান্ত আলাপের ছবি।

জাপান থেকে বাংলার শহরে

রিকশার ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং এর উদ্ভাবন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। ‘রিকশা’ শব্দটি জাপানি ‘জিনরিকিশা’ থেকে এসেছে বলে সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয়। ‘জিন’ অর্থ মানুষ, ‘রিকি’ অর্থ শক্তি এবং ‘শা’ অর্থ বাহন-অর্থাৎ মানুষের শক্তিতে চালিত বাহন। গবেষক এম উইলিয়াম স্টিলির ‘রিকশা ইন সাউথ এশিয়া, ইন্ট্রোডাকশন টু স্পেশাল সেকশন’ গবেষণা থেকে জানা যায়, ১৮৬৯ সালে জাপানে কাহার-টানা পালকির বদলে রিকশা চালু হয়। এরপর সেখান থেকে চীন, হংকং ও সিঙ্গাপুরে ছড়িয়ে যায় রিকশা।

প্রথমে রিকশা আজকের পরিচিত তিন চাকার প্যাডেলচালিত রিকশার মতো ছিল না। উৎপত্তি জাপানে হলেও এর নকশা করেছিলেন জোনাথন স্কোবি নামে মার্কিন এক খ্রিষ্টান মিশনারি। পঙ্গু স্ত্রীকে ইয়োকোহামা শহর ঘুরিয়ে দেখাবেন বলে ১৮৬৯ সালে ‘জিনরিকিশা’ বাহনটি তৈরি করেন।

পরবর্তী সময়ে রিকশা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৮০ সালে ভারতে আসে মিশনারি রেভারেন্ট জোর ফরডাইস হাত ধরে। ১৯০০ সালে সেই রিকশা আসে কলকাতায়। তবে তখন সাধারণ যাত্রী নয়, বরং মালামাল টানার জন্যই এর ব্যবহার ছিল।

 ছবি: এআই

ছবি: এআই

ঢাকার রাস্তায় রিকশার আগমন

পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশে সর্বপ্রথম রিকশা এসেছিল চট্টগ্রামে। সেটি আনা হয়েছিল মিয়ানমারের রেঙ্গুন থেকে। ঢাকায় প্রথম রিকশা আসে ত্রিশের দশকে ভারতের কলকাতা থেকে। ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা: স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে প্রচলিত প্যাডেল দেওয়া সাইকেল রিকশা এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে। তবে এর বিস্তার একদিনে হয়নি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে রিকশা ঢাকার নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

ঢাকায় রিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বদলে যায় শহরের চলাচলের দৃশ্যও। ছোট ছোট গলি, সরু রাস্তা, পুরোনো মহল্লা কিংবা ব্যস্ত বাজার-সবখানেই রিকশা হয়ে ওঠে পরিচিত বাহন। একসময় যে বাহন ছিল কেবল প্রয়োজনের, ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে শহরের সংস্কৃতির অংশ।

বৃষ্টিভেজা শহরে রিকশার যাত্রা ছিল অন্যরকম রোমান্টিক

বৃষ্টিভেজা শহরে রিকশার যাত্রা ছিল অন্যরকম রোমান্টিক

রিকশা হয়ে উঠল প্রেমের বাহক

রিকশার সবচেয়ে রোমান্টিক দিক ছিল তার ধীর গতি। গাড়ির মতো ছুটে যেত না এটি। ফলে পাশাপাশি বসে দুজন মানুষের কথা বলার জন্য হাতে থাকত খানিকটা বাড়তি সময়। কখনো স্কুল-কলেজ শেষে দেখা, কখনো বিকেলে নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা, কখনো বন্ধুর অজুহাতে দেখা করতে যাওয়ারপর তারপর দুজনের একসঙ্গে প্যাডেলচালিত রিকশায় ওঠা। গন্তব্য হয়তো খুব দূরে নয়, তবু পথটা যেন শেষ হতে চাইত না। কারণ তখন গন্তব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পথ।

হুডের আড়ালে করো ব্যক্তিগত পৃথিবী

রিকশার হুড ছিল সেই সময়ের প্রেমের গল্পে আলাদা এক চরিত্র। ব্যস্ত রাস্তার মাঝেও হুড তুলে দিলে চারপাশ থেকে খানিকটা আড়াল তৈরি হতো। একেবারে ব্যক্তিগত জায়গা না হলেও দুজনের মধ্যে তৈরি হতো এক ধরনের স্বস্তি। সেখানে চলত ফিসফিস করে কথা, অভিমান, মান-অভিমান, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কিংবা একেবারেই সাধারণ গল্প। কখনো হয়তো দুজন পাশাপাশি বসে থেকেছে, কিন্তু খুব বেশি কথা বলেনি। তবু সেই নীরবতাটুকুও ছিল সম্পর্কের অংশ।

বিজ্ঞাপন

বৃষ্টির দিনে রিকশার প্রেম

বৃষ্টি আর রিকশার সম্পর্কও আলাদা। হুডে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, ভেজা রাস্তার ওপর চাকার ধীর চলাচল, পাশের মানুষের গায়ে গা লাগিয়ে বসে থাকার স্মৃতি অনেকের কাছেই প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কখনো হুডের ভেতর থেকে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টিভেজা শহর দেখা, কখনো একই ছাতার নিচে দুজনের গা ঘেঁষে বসে থাকা রিকশা তখন শুধু বাহন নয়, হয়ে উঠত স্মৃতির বাক্স।

অপেক্ষারও ছিল আলাদা সৌন্দর্য

আজ একটি ফোন করলেই জানা যায় মানুষটি কোথায়। বার্তা পাঠালে উত্তরও আসতে পারে কয়েক সেকেন্ডে। কিন্তু একসময় দেখা করার আগে এত সহজে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হতো। দূর থেকে একটি রিকশা এগিয়ে আসতে দেখলে মনে হতো-এই তো, সে এসেছে!

আবার কখনো দেখা হওয়ার কথা থাকলেও মানুষটি দেরি করত। অপেক্ষা করতে করতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকা, প্রতিটি রিকশার দিকে চোখ চলে যাওয়ার অপেক্ষাও ছিল প্রেমেরই অংশ।

বিজ্ঞাপন

রিকশা তাই শুধু একটি বাহন নয়

ঢাকার রিকশা এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহরের স্মৃতি, লোকশিল্প, কর্মজীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। ব্যক্তিগত স্মৃতির জায়গা থেকে দেখলে রিকশা আরও অনেক কিছু।

আরও পড়ুন

প্রথম প্রেম-প্রথম ভালো লাগার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

কারো কাছে এটি প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতি। কারো কাছে বৃষ্টিভেজা বিকেল। কারো কাছে বন্ধুত্বের গল্প। আবার কারও কাছে হয়তো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রেমের সময়। সময় বদলেছে। শহর বদলেছে। যোগাযোগের ধরন বদলেছে।

আরও পড়ুন

বড় হয়ে গিয়েও কার্টুন দেখেন, মানসিক স্বাস্থ্যে যেসব প্রভাব পড়ে

বদলে গেছে মানুষের চলার গতিও। তবু পুরোনো কোনো রিকশা চোখে পড়লে কিংবা বৃষ্টির দিনে হুড তোলা একটি রিকশা ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে গেলে অনেকের মনে হয় এখনো ফিরে আসে সেই দিনগুলোর কথা। একটা রিকশা, দুজন মানুষ আর শহরের ব্যস্ত রাস্তা-এইটুকুতেই তৈরি হয়ে যেত একটি সম্পূর্ণ গল্প।

সূত্র: আরামকো ওয়ার্ল্ড, ইউনেস্কো, এরা নাও (‍টু হুইলজ গুড)

এসএকেওয়াই