সন্তান জন্মের পর ওজন নিয়ে কটাক্ষ শুনলে নিজেকে সামলাবেন যেভাবে

প্রকাশিত: ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬

মা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন নারীর জীবনে যেন নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়। সন্তানকে ঘিরে বদলে যায় ঘুম, খাওয়াদাওয়া, কাজের সময়সূচি এবং প্রতিদিনের অভ্যাস। এর পাশাপাশি গর্ভাবস্থা ও প্রসবের প্রভাব পড়ে শরীরেও। কিন্তু এই স্বাভাবিক পরিবর্তনের মধ্যেই নতুন মায়েদের ঘিরে তৈরি হয় এক ধরনের সামাজিক চাপ-সন্তান জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব আগের চেহারা ও ওজনে ফিরে আসতে হবে।

ওজন একটু বেড়ে গেলেই প্রশ্ন, পেটের আকার নিয়ে মন্তব্য, পোশাক নিয়ে অযাচিত পরামর্শ কিংবা ছবি প্রকাশ করলেই শরীর নিয়ে আলোচনা-অনেক নারীই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এই প্রবণতা শুধু সাধারণ নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, ক্যাটরিনা কাইফ, কারিনা কাপুরের মতো তারকারাও মাতৃত্বের পর শরীর ও ওজন নিয়ে জনসাধারণের আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন।

সন্তান জন্মের পর একজন নারীর শরীরকে কেন এমনভাবে বিচার করা হবে। গর্ভাবস্থায় শরীর দীর্ঘ সময় ধরে শিশুকে ধারণ ও পুষ্টি জোগায়। প্রসবের পর সেই শরীরকে সুস্থ হতে এবং নতুন পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগাটাই স্বাভাবিক। তাই শরীরের পরিবর্তনকে ব্যর্থতা বা সৌন্দর্য কমে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।

আগের চেহারায় ফেরাই যেন একমাত্র লক্ষ্য না হয়

সন্তান জন্মের পর কেউ যদি বলেন, ‘আগের মতো দেখাচ্ছে না’, সেই মন্তব্যের কারণে নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগার প্রয়োজন নেই। বরং ভাবুন, কেন আপনাকে আগের অবস্থাতেই ফিরতে হবে?

মাতৃত্বের সঙ্গে শরীরের গড়নে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই এই সময়ে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরকে সুস্থ রাখা, প্রয়োজনীয় শক্তি ফিরে পাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া। দ্রুত ওজন কমানোর চাপের বদলে শরীরের পুনরুদ্ধারকে গুরুত্ব দেওয়াই বেশি প্রয়োজন।

চারপাশের সব পরামর্শ অনুসরণ করবেন না

সন্তান জন্মের পর নতুন মাকে ঘিরে পরামর্শের যেন শেষ থাকে না। কেউ নির্দিষ্ট খাবার খেতে বলেন, কেউ আবার কিছু খাবার পুরোপুরি বাদ দিতে বলেন। কেউ দ্রুত ব্যায়াম শুরু করার পরামর্শ দেন, আবার কেউ ওজন কমানোর নানা পদ্ধতির কথা জানান।
কিন্তু প্রত্যেক নারীর শরীরের অবস্থা, প্রসবের অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজন আলাদা। অন্য কারো জন্য কার্যকর কোনো পদ্ধতি আপনার ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করবে না। তাই নিজের শরীরের পরিবর্তন বুঝে প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা যোগ্য স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

আয়নায় নিজেকে নতুনভাবে দেখুন

সন্তান জন্মের পর আগের পোশাক শরীরে ঠিকমতো না লাগতে পারে। কোমর, পেট বা শরীরের অন্য অংশের গড়নেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কিন্তু পোশাকের মাপ বদলে যাওয়া মানেই নিজের সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলা নয়।

আয়নায় দাঁড়িয়ে শুধু ওজন বা শরীরের কোন অংশ বদলেছে, তা খোঁজার পরিবর্তে নিজের সামগ্রিক সুস্থতার দিকে নজর দিন। আজ শরীর কেমন অনুভব করছে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম হচ্ছে কি না কিংবা দৈনন্দিন কাজ করার মতো শক্তি আছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

অন্যের ছবির সঙ্গে নিজের শরীরের তুলনা নয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মাতৃত্বের পর দ্রুত শরীরচর্চা করে ওজন কমানো কিংবা চেহারা বদলে ফেলার অসংখ্য ছবি ও গল্পে ভরা। এসব দেখে নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা করা খুব সহজ। কিন্তু অনলাইনে দেখা একটি ছবি একজন মানুষের পুরো বাস্তবতা তুলে ধরে না।

তাই অন্যের শরীর কত দ্রুত বদলেছে, তা দেখে নিজের ওপর চাপ তৈরি করার কোনও প্রয়োজন নেই। এমন কনটেন্ট যদি নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তি বা হতাশা তৈরি করে, তাহলে কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিরতি নেওয়াও ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।

ওজন কমানোর সিদ্ধান্ত হোক নিজের স্বাস্থ্যের জন্য

সন্তান জন্মের পর নিজের ইচ্ছায় ওজন কমাতে চাইলে সেটি হতে হবে স্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্যকে কেন্দ্র করে। অন্যের কটাক্ষ বা মন্তব্যের কারণে নয়।

পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রুটিনে ফেরা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শরীরচর্চার দিকে মনোযোগ দেওয়া বেশি জরুরি। শরীরকে দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার তাড়নায় কঠোর ডায়েট বা অতিরিক্ত ব্যায়াম শুরু করা ঠিক নয়।

আর একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, প্রতিটি মন্তব্যের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ শরীর নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করলে তা উপেক্ষা করাও একটি উত্তর। কারণ মাতৃত্বের পর শরীরে আসা পরিবর্তন লুকানোর বা তার জন্য লজ্জিত হওয়ার বিষয় নয়। এই শরীরই একটি নতুন জীবনকে ধারণ করেছে। তাই অন্যের চোখে কেমন দেখাচ্ছেন, তার চেয়ে নিজের শরীর ও মনের যত্ন কেমন হচ্ছে- সেটিই হোক অগ্রাধিকার।