বড় হয়ে গিয়েও কার্টুন দেখেন, মানসিক স্বাস্থ্যে যেসব প্রভাব পড়ে প্রকাশিত: ৬:১৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ ছোটবেলায় কার্টুন দেখার জন্য কখনো খাওয়া ভুলে গেছেন? টিভির সামনে বসে প্রিয় চরিত্রের সঙ্গে কখনো নিজেকেও গল্পের অংশ মনে হয়েছে? বয়স বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে, কাজের চাপ বেড়েছে-তবু হঠাৎ একদিন পুরোনো সেই কার্টুনের কোনো দৃশ্য চোখে পড়তেই মনটা যেন কয়েক বছর পেছনে ফিরে যায়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তখন আমরা শুধু কার্টুন দেখি না, মনের ভেতর যেন পুরোনো একটা দরজা খুলে যায়। ফিরে আসে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার দুপুর, ছুটির দিনের অলস সময়, পরিবারের সঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখার স্মৃতি কিংবা কোনো চরিত্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া ছোটবেলার কল্পনার জগৎ। বিজ্ঞাপন মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর সঙ্গে নস্টালজিয়া বা অতীতের স্মৃতিময় অনুভূতির যোগ আছে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের একটি আলোচনায় মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টিন বাচো নস্টালজিয়াকে অতীতের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ব্যস্ত দিনের শেষে কয়েক মুহূর্তের নস্টালজিয়া গবেষণায় উঠে এসেছে যে, কার্টুন দেখলে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক চাপ সম্পর্কিত অসুস্থতা কমে যায়। কার্টুন বিভিন্ন উপায়ে বিষন্নতা এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। বিজ্ঞাপন ডা. জুলিয়া স্যাম্পটন বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট ‘কার্টুন বা সিটকম যদি আপনাকে হাসাতে পারে, তবে এটি অত্যন্ত থেরাপিউটিক (নিরাময়কারী) হিসেবে কাজ করে’। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ডেভিড রোজমারিন উদ্বেগ দূর করার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, ‘আপনি যখন প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন বা বিষণ্ণ থাকেন, তখন নিজের অনুভূতির ঠিক বিপরীত কোনো কাজে যুক্ত হওয়া উচিত । কার্টুন মানুষের মনোযোগকে নেতিবাচক চিন্তা থেকে সরিয়ে দ্রুত মন ভালো করতে সাহায্য করে’। মজাদার কার্টুন দেখলে হাসতে হাসতে এন্ডোরফিন নিঃসৃত হয় যা ভালো অনুভূতি সৃষ্টিকারী হরমোন। এন্ডোরফিন মেজাজ ভালো করে,আনন্দ বাড়ায় এবং চাপ কমায়। কার্টুন একাকিত্ববোধ এবং দুঃখ কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে কোনো চরিত্রের সংগ্রাম অনেক সময় দর্শকের নিজের জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়। প্রিয় চরিত্রটি যখন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়েও হাল ছাড়ে না, তখন তার সেই লড়াই দর্শকের মধ্যেও একধরনের অনুপ্রেরণা তৈরি করতে পারে। রিচিত চরিত্রই খুলে দিতে পারে স্মৃতির পুরোনো দরজা বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান সরাসরি কার্টুনে পাওয়া না গেলেও কিছু সময়ের জন্য মনকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কর্মক্ষেত্রের চাপ বা দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে বাঁচতে কার্টুনের রঙিন ও কাল্পনিক দুনিয়া একটি ‘সেফ হেভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞাপন কার্টুন দেখলেই বড়দের মন আবার ছোট হয়ে যায়? এমন নয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কার্টুন পছন্দ করেন বলেই তার মানসিক পরিপক্বতা কমে যায়, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং অনেকের কাছে অ্যানিমেশন হতে পারে বিনোদন, হাসি কিংবা কিছু সময়ের জন্য মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকার উপায়। ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি হাঙ্গেরীয় গবেষণায় ৮১৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক দর্শককে নিয়ে করা একটি গবেষণায় অ্যানিমেটেড সিটকম দেখার বিভিন্ন কারণের মধ্যে বিনোদন, সামাজিক ব্যঙ্গ এবং রিল্যাক্সেশন বা মানসিক স্বস্তি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ দিনের পর দিন অফিস, সংসার, সম্পর্ক, অর্থনৈতিক চিন্তা কিংবা নানা দায়িত্বের মধ্যে থাকার পর কেউ যদি রাতে বসে পুরোনো কার্টুনের একটি পর্ব দেখতে ভালোবাসেন, সেটি অনেক সময় শুধুই নিজের জন্য কিছুটা নির্ভার সময় কাটানোর পছন্দ হতে পারে। বিজ্ঞাপন পুরোনো কার্টুনে নস্টালজিয়া ধরুন, অনেক বছর পর হঠাৎ ছোটবেলার প্রিয় কার্টুনের গান শুনলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হয়তো মনে পড়ে গেল সেই ঘর, সেই টেলিভিশন, পাশে বসা মানুষগুলো কিংবা জীবনের এমন একটি সময়, যখন আপনার সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল পরের পর্বটি কখন শুরু হবে! কারণ স্মৃতি শুধু তথ্য জমিয়ে রাখে না; এর সঙ্গে আবেগ, মানুষ, জায়গা ও সময়ও জড়িয়ে থাকে। তাই পুরোনো কোনো চরিত্র বা দৃশ্য বর্তমানের একটি ছোট্ট ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করে অতীতের স্মৃতিকে সামনে নিয়ে আসতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, নস্টালজিক অনুভূতি সৃজনশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। চারটি পরীক্ষায় গবেষকরা দেখেছেন, নস্টালজিয়া অংশগ্রহণকারীদের সৃজনশীল লেখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল এবং এর সঙ্গে ‘ওপেননেস টু এক্সপেরিয়েন্স -এর সম্পর্ক পাওয়া যায়। বিজ্ঞাপন কর্মক্ষেত্রের চাপ থেকে সাময়িক বিরতি প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো দায়িত্বের পরিমাণ। কাজ, পরিবার, অর্থনীতি, সামাজিক সম্পর্ক-সবকিছু সামলাতে গিয়ে নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই জায়গায় প্রিয় কার্টুনের রঙিন ও কাল্পনিক জগৎ সাময়িক মানসিক বিরতি দিতে পারে। কয়েক মিনিটের জন্য বাস্তব জীবনের চাপ থেকে মনোযোগ সরিয়ে অন্য একটি গল্পে ডুবে যাওয়া অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে কার্টুন দেখার সময়ও ভারসাম্য জরুরি। ঘুমের সময় কমিয়ে বা প্রয়োজনীয় কাজ বাদ দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্দার সামনে বসে থাকা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো অভ্যাস নয়। বিজ্ঞাপন কার্টুন কি কল্পনার জগৎ খুলে দেয়? কার্টুনের চরিত্র বাস্তব নয়, তাদের জগৎও অনেক সময় বাস্তবতার নিয়ম মানে না। ফলে দর্শককে এমন একটি কল্পিত জগতে প্রবেশ করতে হয়, যেখানে অসম্ভব ঘটনাও স্বাভাবিক। তবে এখান থেকে সরাসরি বলা যাবে না যে কার্টুন দেখলেই সবার কল্পনাশক্তি বাড়ে। টেলিভিশন দেখা ও কল্পনাশক্তির সম্পর্ক নিয়ে পুরোনো গবেষণাগুলোতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক-দুই ধরনের সম্ভাবনাই আলোচনা করা হয়েছে, কারণ দর্শক কী দেখছেন এবং কীভাবে দেখছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আবার ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো গল্প বা সিরিজ দীর্ঘ সময় মনে থাকা এবং সেটি নিয়ে পরে মনে মনে ভাবা বা কল্পনা করার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ কোনো গল্প আমাদের মনে যত গভীর ছাপ ফেলে, সেটি পরে মনের ভেতর নানা ভাবনা ও কল্পনার খেলা তৈরি করতে পারে। আরও পড়ুন বাবা-মায়ের কেন সন্তানের ছোটবেলার রিপোর্ট কার্ড ফেলে দিতে পারেন না? কার্টুন নয়, ফিরিয়ে আনে নিজেকে সম্ভবত এ কারণেই বড় হয়েও আমরা কার্টুন দেখতে চাই। কারণ সেখানে শুধু একটি চরিত্র থাকে না-থাকে আমাদের জীবনের একটি সময়। ছোটবেলার সেই নির্ভার দুপুর হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু একটি পরিচিত চরিত্র, একটি গান কিংবা একটি দৃশ্য কয়েক মুহূর্তের জন্য সেই অনুভূতিটাকে ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই বয়স ৩০ হোক কিংবা ৪০-কার্টুন দেখে ভালো লাগলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। হয়তো আপনি শিশুসুলভ হচ্ছেন না, বরং আপনার মস্তিষ্ক পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের একটি সেতু তৈরি করছে। আরও পড়ুন বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানকে ভালো-বিপজ্জনক বন্ধুর পার্থক্য শেখাবেন যেভাবে আর সেই সেতুর ওপারেই হয়তো লুকিয়ে আছে আপনার ছোটবেলার সেই মানুষটি- যে একটু হাসত, একটু কল্পনা করত, আর টেলিভিশনের পর্দার ছোt কার্টুনের জগতটাকেই মনে করত পুরো পৃথিবী। সূত্র: মিডিয়াম, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব কমিউনিটি মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, হাফপোস্ট ও অন্যান্য এসএকেওয়াই Download PhotoCard SHARES লাইফস্টাইল বিষয়: বড় হয়ে গিয়েও কার্টুন দেখেনমানসিক স্বাস্থ্যে যেসব প্রভাব পড়ে