আপনার সন্তান কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়াচ্ছে কি না বুঝবেন যেভাবে

প্রকাশিত: ২:১১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

সন্তান হঠাৎ আগের মতো কথা বলছে না, বন্ধুদের পরিচয় গোপন করছে, পড়াশোনায় মন বসছে না কিংবা অকারণে রাতে বাইরে থাকতে চাইছে দেখলে অনেক বাবা-মায়ের মনেই প্রশ্ন জাগে, ‘কী হচ্ছে ওর?’ কৈশোরে সন্তানদের আচরণে কিছুটা পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। নতুন বন্ধু, নিজের মতো চলার ইচ্ছা কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা চাওয়াও এই বয়সের স্বাভাবিক অংশ।

তবে আচরণে যদি একসঙ্গে বেশ কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কী ধরনের পরিবেশে সময় কাটাচ্ছে বাবা-মায়ের সচেতন থাকা জরুরি। কারণ ভুল সঙ্গ বা সহিংস পরিবেশে জড়িয়ে পড়লে শিশুর আচরণ ও মানসিকতায় পরিবর্তন আসতে পারে।

অতিরিক্ত গোপনীয়তা দেখা দিলে সন্তানের সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলুন

অতিরিক্ত গোপনীয়তা দেখা দিলে সন্তানের সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলুন

হঠাৎ বন্ধুদের নিয়ে অতিরিক্ত গোপনীয়তা

সন্তান আগে যেসব বন্ধু বা পরিচিতের কথা স্বাভাবিকভাবে বলত, হঠাৎ তাদের পরিচয় লুকাতে শুরু করলে খেয়াল করুন। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, প্রশ্ন করলে উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে বা একই বিষয়ে বারবার অস্পষ্ট কথা বলাও পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত হতে পারে।তবে শুধু বন্ধুদের কথা গোপন করলেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কৈশোরে ব্যক্তিগত পরিসর চাওয়াও স্বাভাবিক। তাই আচরণের অন্য পরিবর্তনগুলোর সঙ্গেও বিষয়টি মিলিয়ে দেখতে হবে।

ফোনকল ও অনলাইন যোগাযোগে গোপনীয়তা

মোবাইল হাতে নিয়ে সবসময় আলাদা জায়গায় চলে যাওয়া, ফোন এলে কথা লুকানো কিংবা গভীর রাতে অস্বাভাবিকভাবে ফোন ব্যবহার করা চোখে পড়লে সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, অস্বাভাবিক গ্রুপে যুক্ত হওয়া বা এমন কিছু নিয়ে কথা বলা যা সে পরিবারের কাছ থেকে গোপন করছেকি না এসব বিষয়ও খেয়াল রাখুন।

পড়াশোনা ও দৈনন্দিন রুটিনে বড় পরিবর্তন

যে শিশু নিয়মিত স্কুলে যেত, পড়াশোনা করত বা নিজের পছন্দের কাজে সময় দিত, সে হঠাৎ সেসব থেকে দূরে সরে গেলে কারণ জানার চেষ্টা করুন। স্কুল ফাঁকি দেওয়া, পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়া, বাড়ির নিয়মকানুন একেবারে মানতে না চাওয়া বা আগে পছন্দের খেলাধুলা ও শখ ছেড়ে দেওয়ার মতো পরিবর্তন দীর্ঘদিন থাকলে বিষয়টি নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলা দরকার।

হঠাৎ অচেনা টাকা বা দামি জিনিস

সন্তানের কাছে হঠাৎ এমন টাকা, পোশাক, মোবাইল বা অন্য কোনো জিনিস দেখা যাচ্ছে যার উৎস সে পরিষ্কারভাবে বলতে পারছে না-এমন হলে বিষয়টি এড়িয়ে
যাবেন না।

তবে সরাসরি ‘তুমি চুরি করেছ’ বা ‘তুমি খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মিশছ’ বলে অভিযুক্ত না করে শান্তভাবে জানতে চান, জিনিসটি কোথা থেকে এসেছে। অভিযোগের বদলে কথোপকথন করলে সন্তান নিজের কথা বলার সুযোগ পাবে।

মারমুখী আচরণ বা সহিংসতার প্রতি আগ্রহ

হঠাৎ খুব রেগে যাওয়া, সামান্য বিষয়েও মারামারিতে জড়িয়ে পড়া, অন্যকে ভয় দেখানো বা সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখা গেলে গুরুত্ব দিন।

সন্তানের অনলাইন জগতের দিকটিও খেয়াল করা যেতে পারে। সহিংস ভিডিও, মারামারির কনটেন্ট বা বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ থাকলে কেন এগুলো তার ভালো লাগছে, তা নিয়ে কথা বলুন।

বাড়ির বাইরে থাকার সময় বেড়ে যাওয়া

সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে বাবা-মায়ের মোটামুটি ধারণা থাকা দরকার। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই রাত করে বাড়ি ফেরা, কোথায় ছিল সে বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য না দেওয়া কিংবা বারবার এমন জায়গায় যাওয়া যেখানে পরিবারের কেউ তাকে চেনে না এমন পরিবর্তন নজরে রাখা উচিত। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ না করে সন্তানের নিরাপত্তার জন্য কিছু স্পষ্ট নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে।

আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন

কিশোরের আচরণে একসঙ্গে অনেক পরিবর্তন দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। যেমন-হঠাৎ খুব চুপচাপ হয়ে যাওয়া, পরিবারের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া, অস্বাভাবিক রাগ, নিয়মিত মিথ্যা বলা, স্কুলে অনুপস্থিতি, পুরোনো বন্ধুদের এড়িয়ে চলা বা নতুন একটি দলের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কাটানো।

শরীরে আঘাতের চিহ্ন

সন্তানের শরীরে বারবার কাটাছেঁড়া, কালশিটে বা মারামারির আঘাত দেখা যাচ্ছে এবং সে কারণটি এড়িয়ে যাচ্ছে- তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে জানার চেষ্টা করুন।
তবে আঘাতের কারণ অনেক কিছুই হতে পারে। তাই অনুমান না করে সন্তানের কাছ থেকেই জানতে চেষ্টা করুন কী ঘটেছে এবং সে নিরাপদ আছে কি না।

সন্তানকে জেরা  না করে কথা বলুন

সন্তানের আচরণে পরিবর্তন দেখলেই মোবাইল কেড়ে নেওয়া, মারধর করা বা সবার সামনে অপমান করা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। বরং নিরিবিলি সময়ে তার সঙ্গে কথা বলুন।

‘তুমি কার সঙ্গে মিশছ?’-এর পাশাপাশি জিজ্ঞেস করতে পারেন, ‘নতুন বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে কেমন লাগছে?’, ‘কেউ কি তোমাকে এমন কিছু করতে চাপ দিচ্ছে, যেটা তুমি করতে চাও না?’ কিংবা ‘কোনো সমস্যায় পড়লে আমাকে বলতে ভয় পাচ্ছ কি না?’
সন্তান যেন বুঝতে পারে, বিপদে পড়লে শাস্তির ভয় নয়, বাবা-মায়ের কাছেই সে নিরাপদে সাহায্য চাইতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

প্রয়োজনে স্কুল ও বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন

সন্তানের আচরণে দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর পরিবর্তন থাকলে স্কুলের শিক্ষক, কাউন্সেলর বা শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। যদি সন্তান সহিংসতা, অপরাধ বা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ দলের চাপের মধ্যে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্বশীল বড়দের ও প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন

বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানকে ভালো-বিপজ্জনক বন্ধুর পার্থক্য শেখাবেন যেভাবে

সন্তানকে ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখার আগে তার সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করা। কৈশোরে বন্ধুত্ব ও পরিবেশের প্রভাব থাকে ঠিকই, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্কও শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বাবা-মায়ের কেন সন্তানের ছোটবেলার রিপোর্ট কার্ড ফেলে দিতে পারেন না?

সন্তানের আচরণে পরিবর্তন দেখলেই আতঙ্কিত না হয়ে নিয়মিত কথা বলুন, তার বন্ধু ও দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে জানুন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত সহায়তা নিন। কারণ অনেক সময় সন্তানের আচরণই তার ভেতরের কোনো সমস্যার প্রথম সংকেত হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: বিবিসি, ইয়ূথ ইউনিটি, ফ্যামিলি লাইফ

এসএকেওয়াই